যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে একটি নতুন প্রতিবেদনে। ক্রাক্স অ্যানালিটিকস নামের একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২৪ জুলাই, যেদিন পুরনো আন্তর্জাতিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হয়ে ৮০টি দেশের ওপর নতুন স্থায়ী শুল্ক কার্যকর হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দেউলিয়াত্বের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে ৮৩৩-এ পৌঁছেছে। গুগলে ‘জরুরি ঋণ’ ও ‘নগদ প্রবাহ’ শব্দগুলোর অনুসন্ধানও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রশাসনের (এসবিএ) ঋণ বিতরণ ২০২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, তবে ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক ঋণ কমেছে। ক্রাক্সের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সবকিছু মিলিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে একটি ঐতিহাসিক উদ্বেগজনক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

ক্রাক্সের প্রধান নির্বাহী জ্যাকব বেনেট বলেছেন, এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন। ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু শুল্ক বাতিল করে দেয়, কিন্তু একই দিনে প্রেসিডেন্ট অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেন। ২৪ জুলাই সেই অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হলে নতুন স্থায়ী শুল্ক কার্যকর হয়। বেনেটের ভাষায়, ‘এটি মূলত অস্থিরতার গল্প। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক নীতির সুস্পষ্ট সাফল্য দেখা গেলেও, ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য পরিবেশ এমন যে তারা কখন কীভাবে পরিবর্তন হবে তা জানে না—কখনো কখনো দিনের পর দিন। এই হুইপল্যাশ প্রভাবই উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবসা ধসের কারণ হয়েছে।’

ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে, ৭৭ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা তাদের প্রধান বাধা হিসেবে বাড়তি খরচের কথা বলেছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ বিশেষভাবে শুল্ক-সম্পর্কিত খরচকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, বিশেষ করে উৎপাদনকারী ও খুচরা বিক্রেতারা। জরিপে আরও দেখা যায়, ৬০ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা গত ১২ মাসে কোনো না কোনো আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছে, যার মধ্যে ৫৬ শতাংশ দৈনন্দিন ব্যবসা চালানোর জন্য এবং মাত্র ৪৬ শতাংশ সম্প্রসারণের জন্য ঋণ চেয়েছে।

ক্রাক্সের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা হতাশায় ব্যয়বহুল মার্চেন্ট ক্যাশ অ্যাডভান্স বা উচ্চ-সুদের ক্রেডিট কার্ডের মতো উৎস থেকে নগদ সংগ্রহ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও ঋণের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বেনেট বলেন, ‘তারা জরুরি মূলধনের সন্ধান করছে—যেকোনোভাবে নিজেদের শক্ত অবস্থানে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অনেক ক্ষেত্রেই সেই মূলধন স্বাস্থ্যকর নয়।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ২৪ জুলাইয়ের পর শুল্ক নীতির পরিবর্তনের কারণে আর্থিক চিত্র আরও খারাপ হতে পারে।

তবে সব বিশেষজ্ঞ একমত নন। ফিলাডেলফিয়ার এসবিএ ঋণ ব্রোকার মাল্টিফান্ডিংয়ের প্রধান নির্বাহী আমি কাসার বলেছেন, তিনি তেমন উদ্বিগ্ন নন। তার প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এ বছর ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করছেন তিনি, কারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে এসবিএ ঋণের চাহিদা ব্যাপক। কাসার বলেন, ‘কিছু ব্যবসা কঠিন সময় পার করছে, আবার কিছু ব্যবসা ১০০ মাইল বেগে এগিয়ে চলেছে—সবকিছু ঠিক আছে। আমি একে সামগ্রিক প্রবণতা হিসেবে দেখছি না।’ তিনি দেউলিয়াত্বের পরিসংখ্যানকেও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন না, কারণ দেউলিয়াত্ব ফাইল করার খরচ ৩০ থেকে ৫০ হাজার ডলার, ফলে বেশিরভাগ ছোট ব্যবসা কেবল বন্ধ করে দেয়।

ইন্ডিয়ানাপোলিসের আইনজীবী স্কট অলিভার বলেছেন, ক্রাক্সের প্রতিবেদনটি আশ্চর্যজনক নয়, বরং এটি ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে চলমান আলোচনার পেছনে তথ্য সরবরাহ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসবিএ ঋণ ব্যবহার করে ‘টিকে থাকা’ বনাম ‘বৃদ্ধি’—এই পার্থক্য খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়, কারণ এসবিএ সবসময় কার্যকরী মূলধনের জন্য ঋণ দিতে প্রস্তুত। অলিভার বলেন, ‘নগদ সংকট বাস্তব। অনেক ব্যবসা যখন শুল্ক বা ভবিষ্যতে বাড়তি খরচ দেখে, তখন অনিশ্চয়তার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।’ তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিবেশে সুস্থ ব্যবসা একসঙ্গে ধসে পড়ছে না, বরং অনিশ্চয়তা মূলধনের চাহিদা বাড়িয়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসা পিয়ার অ্যাডভাইজরি গ্রুপ স্কেলপাথের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি র্যান্ড লারসেনও অতটা উদ্বিগ্ন নন। তার প্রায় ১০০ সদস্যের ওপর জরিপ করে তিনি দেখেছেন, গড় প্রতিক্রিয়া ছিল ‘সতর্ক’। লারসেন বলেন, ‘অনিশ্চয়তা’ শব্দটি গত এক-দুই বছরের মূল শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তার গ্রুপের সদস্যদের জন্য কার্যকরী মূলধন সংগ্রহ কোনো সমস্যা নয়। বাস্তবতা হলো, উদ্বেগ ও আত্মবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থানে আছে আমেরিকার ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো। লারসেনের ভাষায়, ‘তারা রোদ আর রামধনু দেখছে না, কিন্তু তবুও তাদের কোম্পানি বেড়ে উঠবে—কেউ শিগগির দেউলিয়া হবে বলে মনে হয় না।’