চলমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানি বিল মেটাতে সরকারকে অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার খরচ করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য প্রকাশ করেন। ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই সেমিনারে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধন। প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির দিকে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে এবং বাজেটে এই খাতে নানা ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। এখন এই খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে থাকা যেকোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। ডিরেগুলেশন বা সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এটি বলা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন, তবে সরকার এ ব্যাপারে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিদ্যমান সমস্যা এক দিনে সমাধান হবে না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই খাতে সময় লাগবে এবং জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বলেও জানান তিনি। যারা প্রণোদনার শর্ত পূরণ করতে পারবে তারাই ঋণ সহায়তা পাবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না। কর-জিডিপির অনুপাত না বাড়ালে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না বলে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে অটোমেশনের বিকল্প নেই। পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর সুফল শিগগিরই দেশবাসী পাবেন।
অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশ এখন যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না, বরং পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে হয়রানি একটি নেতিবাচক কাঠামো তৈরি করেছে, ফলে সংস্কার কার্যক্রম ফলপ্রসূ হচ্ছে না। করজাল সম্প্রসারণে হয়রানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই এবং এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি এসএমই খাতের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ। সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়ন তদারকির জন্য ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও তিনি রাখেন।
দেশে বর্তমানে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করেন আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান। উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা পরিচালনার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তিনি জানান। নীতিমালা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে যথেষ্ট ফারাক থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মত দেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার। রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে যতটা উদার, পণ্য আমদানিতে ততটাই কঠিন অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উচ্চ শুল্কহার স্থানীয়ভাবে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তার অভিমত।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কর আহরণে বিপ্লব ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বাজেটে কিছু ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন না থাকায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতি সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রমুখ। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, আবুল কাসেম খান, বেনজীর আহমেদ ও রিজওয়ান রাহমান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
প্রবাসী আয়নির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতি খুবই উদ্বেগের বিষয় বলে মন্তব্য করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করা কঠিন বলে তিনি জানান এবং ব্যাংকের তারল্য বাড়ানোর ওপর জোর দেন। বাজেটে ব্যবসাবান্ধব নীতি থাকলেও বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি বলে মন্তব্য করেন ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান। উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাত থেকে সরকারের বেশি ঋণ গ্রহণের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বন্দর ও কাস্টমস সেবার দক্ষতা বাড়াতে সরকারকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। জ্বালানি প্রাপ্তিসহ সহায়ক ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া শুধু সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না বলে মন্তব্য করেন ব্যাংকার সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ, যা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়।




