মাত্র তিন মাস আগে পাস হওয়া 'সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬' আবার সংশোধন করে আরও কঠোর করতে চলেছে সরকার। গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর তথ্য প্রচারকে অপরাধের আওতায় এনে শাস্তির বিধান জোরদার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সূত্রমতে, সংশোধিত আইনের খসড়ায় একটি নতুন ধারা (২৬/ক) যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাইবার পরিসরে কেউ গুজব বা অপতথ্য ছড়ালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাকেই গুজব হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। অপতথ্য বলতে বোঝানো হয়েছে মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়।

নতুন সংশোধনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, অডিও বা ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানোর বিরুদ্ধে এই কঠোর বিধান আনা হচ্ছে। আইনের ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয়প্রয়েন্ট করার জন্য পাঁচ বছর এবং নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এখন শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মতো অন্যান্য সংস্থাকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তবে আইনের ভাষায় সরাসরি কোনো সংস্থার নাম উল্লেখ না থাকলেও এনটিএমসির নামটিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই সংশোধনী প্রসঙ্গে আগাম সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তাদের মতে, এ উদ্যোগ আওয়ামী লীগ সরকারের সমরে কার্যকর হওয়া বিতর্কিত 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন'-এর যুগে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী অভিমত ব্যক্ত করেন, তড়িঘড়ি করে পাস না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত। তিনি মনে করেন, আইনটি পাস হলে এর অপব্যবহার অনিবার্য এবং অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, 'গুজব' ও 'অপতথ্য'-এর মতো শব্দগুলোর সংজ্ঞা অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট না হলে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র আইনটি সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলছে, সামাজিক মাধ্যমে সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো বেড়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। অন্যদিকে, সরকারের অভ্যন্তরেও এই সংশোধনী নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এর ফলে সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ভিন্নমত দমনের অভিযোগে কলুষিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে। তার পরিবর্তে 'সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫' জারি হয়, যা পরে গত 30 এপ্রিল 'সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬' হিসেবে সংসদে পাস হয়। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনেই এই নব সংশোধিত আইনটি পাস হতে পারে বলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।