বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দরপতন দেখা যাচ্ছে। পূর্বাঞ্চলীয় সময় আজ সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ব্রেন্ট বেঞ্চমার্কে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের দিন সকালের তুলনায় এই দাম ১ দশমিক ৩২ ডলার কম। এক মাস আগে যেখানে তেলের দাম ছিল ৭৮ দশমিক ৯২ ডলার, সেখানে বর্তমান দর ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ উপরে। এক বছর আগে ৬৬ দশমিক ১২ ডলারে লেনদেন হলেও এখন সেটি ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে গেছে।

তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে কোনো নিশ্চিততা নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মন্দা, যুদ্ধ বা অন্য যেকোনো বড় সংকটের আশঙ্কা তৈরি হলে তেলের বাজারে হঠাৎ করে বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। মূলত সরবরাহ ও চাহিদার এই মৌলিক টানাপোড়েনই শেষ পর্যন্ত তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়।

রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে চালকরা যে পাম্পের দাম দেখেন, তার সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দামের সরাসরি সম্পর্ক আছে। তবে পাম্পের দামে কাঁচা তেলের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু খরচ যোগ হয়। পরিশোধন খরচ, পাইকারি ব্যয়, সরকারি কর এবং পাম্প মালিকদের লাভের অংশ — সব মিলিয়েই সেই দাম তৈরি হয়। যেহেতু কাঁচা তেল পাম্পের দামের অর্ধেকের বেশি অংশ দখল করে, তাই এর প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। তেলের দাম বাড়লে পাম্পের দামে তা দ্রুত প্রতিফলিত হয়। তবে দাম কমলে পাম্পের দাম ধীরে ধীরে কমে — যাকে অর্থনীতির ভাষায় 'রকেটস অ্যান্ড ফিদার্স' প্রভাব বলা হয়।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে, যার নাম স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ। নিষেধাজ্ঞা, ঘূর্ণিঝড় বা যুদ্ধের মতো দুর্যোগে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ। সরবরাহে ধাক্কা লাগলে তেলের দাম যাতে অত্যধিক না বেড়ে যায়, সেটিও এই মজুদ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; বরং জ্বালানি সংকটে তাৎক্ষণিক ভরসা হিসেবে এটি কাজ করে। এর মাধ্যমে ভোক্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোকে সচল রাখা সম্ভব হয়।

তেলের সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামেরও একটা যোগসূত্র রয়েছে। তেলের দাম বেড়ে গেলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেদের কার্যক্রমে যেখানে সম্ভব প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে ঝুঁকতে পারে। এর ফলে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায় এবং তার দামও প্রভাবিত হয়।

তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য মূলত দুটি বেঞ্চমার্ক অনুসরণ করা হয় — ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)। বিশ্বের বেশিরভাগ লেনদেন হওয়া তেলের দাম নির্ধারিত হয় ব্রেন্টের ভিত্তিতে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্র তুলে ধরতে এটি বেশি নির্ভরযোগ্য। মার্কিন শক্তি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) তাদের বার্ষিক শক্তি পূর্বাভাসেও ব্রেন্টকে প্রাথমিক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।

বহু দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তেলের বাজার কখনোই স্থিতিশীল ছিল না। যুদ্ধ এবং সরবরাহ সংকটের কারণে দাম অনেক সময় তীব্রভাবে বেড়েছে, আবার মন্দা বা অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ধসও নেমেছে। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে ইয়ম কিপপুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য তেল রপ্তানি কমিয়ে দিলে প্রথম বড় জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়া এবং ওপেকের বাইরের নতুন উৎপাদকদের আবির্ভাবে দাম পড়ে যায়। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় দাম লাফিয়ে ওঠে, কিন্তু অর্থনৈতিক সঙ্কটে তা আবার ধসে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড লকডাউনের সময় চাহিদা এতটাই কমে যায় যে দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল।

মূলত যুদ্ধ, মন্দা, ওপেকের নীতি, জ্বালানি খাতের নতুন উদ্যোগ — সবকিছু মিলিয়েই তেলের বাজারের এই ওঠানামা। দাম নির্ধারণে সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক সংবাদ এবং ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনের নীতিও তেলের দামকে প্রভাবিত করে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের উপকূলীয় সমভূমিতে ১৫ লাখ একরের বেশি জমি তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য খুলে দেয়, যা বিডেন প্রশাসনের সময় সীমিত ছিল।

ফিউচারস মার্কেট খোলা থাকাকালীন সময়ে তেলের দাম প্রায় প্রতি মুহূর্তেই বদলাতে থাকে। ফিউচারস মার্কেট মূলত একটি নিলাম প্রক্রিয়া, যেখানে ভবিষ্যতে তেল কেনা-বেচার চুক্তি করা হয়। যতক্ষণ এই চুক্তি চলতে থাকে, ততক্ষণ দাম বদলাতে থাকে। মার্কিন শেল তেল উত্তোলনও দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। শেল থেকে যত বেশি তেল উত্তোলন করা যায়, সরবরাহ তত বাড়ে, ফলে দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার সম্ভাবনা কমে।

তেলের দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যায়। জ্বালানি খরচ তো বাড়েই, সেই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। ফলে খুচরা বাজারে পণ্যের দামও চড়া হয়ে ওঠে।