রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ১৭ একর জায়গার ওপর অবস্থিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ এখন ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তরিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বাসভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। আজ বুধবার জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিন সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন।
জাদুঘরটি এখন থেকে প্রতিদিন সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিন বাদে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে। উদ্বোধনের পর জাদুঘরের পশ্চিম প্রান্তের প্রধান প্রবেশপথে জুলাই যোদ্ধারা অপেক্ষা করছিলেন। নোটিশ অনুযায়ী তারা ও গণমাধ্যমকর্মীরা বেলা ২টা ১৫ মিনিটে প্রবেশ করতে পারবেন বলে জানানো হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেট খোলা হচ্ছিল না। সে সময় শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। শেষ পর্যন্ত বিকেল চারটার দিকে অপেক্ষমাণ জুলাই যোদ্ধারা স্লোগান দিয়ে মিছিল করে জোর করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন।
ভেতরে প্রবেশ করলেই লাল ইট বিছানো পথের পাশ দিয়ে নানা ধরনের ফলের গাছ দেখা যায়। পাশেই তৈরি করা হয়েছে ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ নামের একটি দীর্ঘ প্যানেল, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র ও স্বৈরাচারের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের চিত্রাবলি স্থান পেয়েছে।
প্রধান ফটকসংলগ্ন পথের দক্ষিণ অংশে বিশাল সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠের একটি অংশে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই মেমোরিয়াল’। সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে বৃত্তাকারে ঘেরা এই মেমোরিয়ালের পাথরে উৎকীর্ণ রয়েছে হাজার হাজার শহীদের নাম। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে নিহত প্রায় চার হাজার ব্যক্তির নাম এখানে লেখা আছে। ভেতরের স্থানটি সবুজ ঘাসে ছেয়ে থাকা সারি সারি কবরের মতো। সামনে বড় প্রস্তরফলকে লেখা ‘দেশপ্রেমীদের রক্ত খেয়ে বাঁচত যাহার সিংহাসন/ সব শহীদের দখলে আজ সেই খুনিটার আবাসন’।
মূল জাদুঘরের চারপাশের সবুজ মাঠের বিভিন্ন স্থানে জুলাই অভ্যুত্থানের আলোড়ন সৃষ্টি করা বেশ কিছু ঘটনা অবলম্বনে ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিকশার ওপরে গুলিবিদ্ধ লাশ, পুলিশের সাঁজোয়া যানে ঝুলে থাকা আন্দোলনকারীর মৃতদেহ, সাইকেল চালিয়ে মিছিলে যাওয়া স্কুলছাত্রী—এমন অসংখ্য ভাস্কর্য। এ ছাড়া মাঠে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, জুলাইয়ের নারী যোদ্ধা, পুকুরের পাশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পড়ে থাকা মৃতদেহ, গুমের জন্য র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, শাপলা চত্বরের হত্যা-নির্যাতনসহ অনেক ঘটনার স্মারক ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে। মাঠের দক্ষিণ অংশে ‘আয়নাঘর’ নামে কুখ্যাত গোপন বন্দিশালার আদলে প্রতীকী আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছে।
মূল জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। দোতলা এই ভবনে প্রবেশ করতে হয় উত্তর দিকের পথ দিয়ে। প্রথমেই দর্শকেরা বড় আকারের একটি কক্ষে প্রবেশ করেন, যার মেঝের মাঝখানে কাচের বলের মতো দেখতে গ্লোব টিভি রাখা আছে। এতে অনবরত শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও ভেসে উঠছে।
জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব নিদর্শনগুলো সাজানোর বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, নিচতলায় মূলত গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে জনগণের ওপর চালানো নির্যাতন, গুম, খুন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের নামে নিষ্পেষণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এখানে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যা, পিলখানায় বিডিআর হত্যার মতো ঘটনাও রয়েছে। গণভবনে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র—ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ, আর্থিক লুটপাটসহ অনেক দুর্নীতির প্রমাণ এখানে সংরক্ষিত আছে। আছে লাল টেলিফোন রাখা টেবিল-চেয়ার। শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম-খুন হওয়া ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির সময় তোলা তাঁদের পরিবারের ছবিও জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।
‘কল রুম’ নামে পরিচিত বড় ঘরটি, যেখানে শেখ হাসিনা বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা বা দেশের বড় বড় কর্মকর্তা, তিন বাহিনীর প্রধান প্রমুখের সঙ্গে সভা করতেন, সেই ঘরের মেঝে বিশেষ ধরনের পুরু কাচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের দিন শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ সীমানাপ্রাচীর ভেঙে গণভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। সেই গণরোষের চিহ্ন ভবনের কক্ষগুলোর দেয়ালে অক্ষত রাখতেই মেঝেটি কাচ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দর্শকরা এই কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারবেন। নিচতলার অন্যান্য কক্ষে আয়নাঘরে বন্দীদের পেটানোর চাবুক, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক চেয়ারসহ নানা নির্যাতনের যন্ত্রপাতি দেখা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্দোলনের ভিডিও চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, সাক্ষাৎকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা নিদর্শন রয়েছে।
দোতলাটি জুলাই আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। মহাপরিচালক জানান, এখানে অন্তত ৫০০ শহীদের ব্যবহৃত সামগ্রীসহ অনেক নিদর্শন রয়েছে। জাদুঘরের সংগ্রহে আরও অনেক নিদর্শন থাকলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় সব একসঙ্গে প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। সংগ্রহ এখনো চলছে। দোতলায় শেখ হাসিনার প্রশস্ত শয়নকক্ষটি বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর করেছিলেন। তাঁর বিছানায় শহীদের নাম লেখা একটি আচ্ছাদন পেতে রাখা হয়েছে, তার ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে শহীদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেই লম্বা প্যাসেজে জুলাই আন্দোলনের টাইমলাইন রয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের ঘটনার বিবরণের সঙ্গে আলোকচিত্র, ভিডিও, চিত্রকর্মসহ অনেক নিদর্শন রাখা হয়েছে।
দোতলায় ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ নামে একটি কক্ষের চার দেয়ালজুড়ে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত ডিজিটাল পর্দা বসানো হয়েছে। সেখানে ৩৬০ ডিগ্রি কোণ থেকে ১০টি প্রজেক্টরে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য প্রদর্শিত হয়। মেঝেতে দর্শকদের বসার জন্য আসন পাতা আছে। এখানে দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে দর্শকের এমন অনুভূতি হবে, যেন তিনি নিজেই পর্দার সেই ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করেছেন। আরেকটি কক্ষে মিছিলে উত্তাল রাজধানীর দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে, অন্যটিতে নারীশিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের দৃশ্য। কোথাও কোথাও ছাদ থেকে সূচিকর্মে আন্দোলনের দৃশ্যখচিত স্ক্রল ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্যাসেজে আন্দোলনের দৃশ্যের চিত্রকর্ম, ডিজিটাল পোস্টার, ভাস্কর্যসহ হরেক রকমের নান্দনিক শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। কক্ষ, বারান্দা, প্যাসেজসহ বিভিন্ন স্থানে শহীদদের পোশাক, বই, খাতা, ক্রীড়াসামগ্রীসহ বিভিন্ন নিদর্শন সাজিয়ে রাখা হয়েছে। জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার স্লোগান লেখা রয়েছে।
মূল জাদুঘরের জায়গা ছোট হওয়ায় একসঙ্গে অনেক দর্শক প্রবেশ করতে পারবেন না। তাই তিনটি পর্বে দর্শকদের আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেলা ১১টা থেকে ১টা, বেলা ১টা থেকে ৩টা এবং শেষ পর্ব বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। এই সময়ের মধ্যে দর্শকেরা মূল জাদুঘরের নিদর্শন দেখতে পারবেন। তবে জাদুঘর থেকে বের হয়ে মাঠে যতক্ষণ ইচ্ছা ঘুরে বেড়ানো, পুকুরপাড়ে বসে বা ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডা দিয়ে সময় কাটানো যাবে। টিকিটের দাম বড়দের জন্য ৫০ এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা। জুলাই ৩৬ স্মৃতি জাদুঘরের ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে বা সরাসরি জাদুঘরে গিয়েও টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।



