আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এ ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম করে রাখার ঘটনায় দায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন নূরে আলম। এর আগে ১২ আগস্ট দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেছিলেন, ২০১৬ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ওই বছরের ১২ এপ্রিল রাতে তাঁকে অপহরণ করা হয়।
আজকের বক্তব্যে নূরে আলম জানান, র্যাব–৪-এ কয়েক মাস গুম থাকার পর তাঁকে র্যাব–১০-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাখা কক্ষটি অত্যন্ত ছোট ছিল; এর প্রস্থ ছিল আড়াই থেকে তিন ফুট এবং দৈর্ঘ্য সাড়ে ছয় থেকে সাত ফুট। কক্ষের ভেতরে একটি শৌচাগার ও একটি পানির ট্যাপ ছিল। এক রাত সেখানে কাটানোর পর ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর তাঁকে গাড়িতে তোলা হয়। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা যাত্রার পর তাঁকে আবার একই ধরনের ছোট কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে শুয়ে পড়লে তাঁর পা শৌচাগার পর্যন্ত পৌঁছে যেত; বাঁ দিকে নড়াচড়া করলে পা পানির ট্যাপে লাগত।
কয়েক দিন পর তাঁকেসহ অন্যদের একটি গাড়িতে করে দেড় ঘণ্টা চালিয়ে একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় তাঁদের রাখা হয়। গুমকারীরা বিভিন্ন ধরনের ভারী সামগ্রী এনে মেঝেতে রাখে। এরপর র্যাবের সদস্যরা ভেতরের দিক থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। র্যাবের গাড়িগুলো সাইরেন বাজিয়ে টহল দিতে থাকে এবং হ্যান্ডমাইকে চিৎকার করা হয়। তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে সেখানে একটি মিথ্যা জঙ্গি উদ্ধারের নাটক সাজানো হয়।
পরে সেখানে চট্টগ্রাম র্যাব–৭-এর তৎকালীন প্রধান কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত হন। তিনি তাঁদের চোখ খুলে দিতে বলেন। চোখ খোলার পর তাঁরা সেখানে বিভিন্ন অস্ত্র, গোলাবারুদ, বলবেয়ারিং, তার, গুনা, পেরেক ও বই দেখতে পান। এভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে সফল অভিযানের নাটক করে র্যাব। পরে রাতে আকবর শাহ থানায় তাঁদের হস্তান্তর করা হয় এবং থানা-পুলিশ মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহানায় পাঠায়।
র্যাব রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তৎকালীন এএসপি রুহুল আমিন তাঁকে বলেন, ডিজিএফআইয়ের লোকজন তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে এবং প্রথমে রাখা স্থানটি ছিল ডিজিএফআইয়ের, পরেরটি ছিল টিএফআইয়ের। জবানবন্দিতে নূরে আলম তাঁর গুমের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ডিজিএফআই ও র্যাবের লোকজনকে দায়ী করেন। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি তিনি ক্ষতিপূরণও দাবি করেন।
এই মামলায় মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন—ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী—ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন এবং আজ তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি ১০ জন পলাতক। পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক—লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। আরও আছেন সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকও পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন।




