২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের খবর পেয়ে রীতিমতো নড়েচড়ে বসেন রিফাত রশিদ। তাঁর ভাষ্যমতে, কোটা সংস্কারের আন্দোলনেই প্রথম রাজপথে মার খেয়েছিলেন এবং সেই রক্তের বিনিময়েই কোটা বাতিল হয়েছিল। খবর পাওয়ার পর আখতার হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মেসেঞ্জার গ্রুপে আলোচনা শুরু হয়—আবার আন্দোলনে নামা উচিত কি না। একই সময়ে ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে আন্দোলন হয় হাইজ্যাক হবে, নয়তো ‘শিবির’ তকমা দিয়ে দমন করা হবে। তাই সংগঠনের সিদ্ধান্তের আগেই সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে মানববন্ধনের ঘোষণা দেন তিনি। পরে সবাই আন্দোলনের পক্ষে একমত হয়। ‘কোটা পুনর্বহাল করা চলবে না’ নামে একটি গ্রুপ খোলা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় মানববন্ধন শুরুর আগেই প্রায় ১৫ হাজার সদস্যের কমিউনিটি গড়ে ওঠে। এই নেটওয়ার্কের ফলে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের উদ্যোগের আগেই আন্দোলনের নেতৃত্ব ছাত্রশক্তির হাতে আসে এবং প্রতিদিন আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে।
রিফাত রশিদের দায়িত্ব ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ফেসবুক গ্রুপ তৈরি এবং সমন্বয় করা। আসিফ মাহমুদের সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব ছিল ঈদের ছুটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমন্বয় করা। আবু বাকের মজুমদার ও হাসিব আল ইসলাম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, হান্নান মাসউদ সারা দেশের মহানগর ও জেলা, আবদুল কাদের লজিস্টিকস ও মিছিলের শৃঙ্খলা দেখতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের সিআর ও হলের প্রতিনিধিদের সংগঠিত করে ফেলায় ১ জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তা দ্রুত বেগবান হয়। ৩ জুলাইয়ের মধ্যে এত বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হয় যে মাঝরাতে একটি গ্রুপ কলেই পুরো ক্যাম্পাসে মিছিল নামিয়ে ফেলা সম্ভব ছিল।
সারা দেশের কৌশলগত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছিল। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ছোট কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লার মতো জেলাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো প্রধান মহাসড়ক অচল করে দিতে সক্ষম ছিল। ফলে একটি ফোন কলেই সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা অচল করে দেওয়া সম্ভব ছিল। আন্দোলনকে ‘জাশি’ ট্যাগিং করে হামলা ঠেকাতে হলে থাকা ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েদের প্রয়োজন ছিল। সব ছাত্রসংগঠনের ঐকমত্য জরুরি ছিল বলে নাহিদ ভাই ও আসিফ ভাই বামপন্থী সব ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বসেছিলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব বাম সংগঠন কোটা আন্দোলনের পক্ষে থাকার ঘোষণা দেয়। ছাত্রদলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন আসিফ ভাই। ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রশক্তির পূর্বে ‘মার্চ ফর প্যালেস্টাইন’ নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও পরে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান হয় এবং ছাত্রশিবির সাংগঠনিকভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়।
১৬ জুলাই রাতে যাত্রাবাড়ীতে মশিউর ভাইয়ের বাসায় এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হয়। সেখানে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবদুল কাদের, আবু বাকের মজুমদার, হাসিব আল ইসলাম ও রিফাত রশিদ উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে হবে। সেদিন থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। সব হলকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসমুক্ত করা হলে হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্র্যাকডাউন চালান। প্রশাসন ক্যাম্পাস ও হলগুলো বন্ধ করে দেয়। শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একটি গ্রুপকলে পরবর্তী কর্মসূচি ও দফা নির্ধারণ করা হয়। রিফাত রশিদকে ১১ দফা খসড়া লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই দফাগুলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রকাশ করা হয়। এরপর হাসনাত ভাইকে প্রেস রিলিজ লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ডিজিএফআই চাপ দিচ্ছিল আলোচনায় বসার জন্য। তারা ডাকসুতে প্যানেল ধরে জিতিয়ে দেওয়া এবং নাহিদ ইসলামকে প্রতিমন্ত্রী বানানোর প্রলোভনও দেখিয়েছিল। হাসনাত ভাই একটি প্রেস রিলিজ লেখার পর পরদিন সংবাদমাধ্যমে ‘শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসতে রাজি’ শিরোনামে খবর আসে। পরে দেখা যায়, হাসনাত ভাই প্রকৃতপক্ষে সেই লেখা সংবলিত প্রেস রিলিজই পাঠিয়েছিলেন, যা নিয়ে বাকি সমন্বয়কদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।
ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। রিফাত রশিদ গ্রেপ্তার এড়াতে বারবার লোকেশন পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। একবার ফোন অন করলেই সেই লোকেশনে আর থাকা সম্ভব ছিল না। টেলিভিশনে দেখতে পান হাসনাত ভাই, সারজিস ভাই ও হাসিব আল ইসলাম রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আইনমন্ত্রী, আইসিটি মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ৮ দফা ঘোষণা করেন। সেখানে ১১ দফার গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো অনুপস্থিত ছিল। পরে তাঁরা জানান, ডিজিএফআই জোরপূর্বক তা পাঠ করিয়ে নিয়েছে। আবদুল কাদের ৯ দফা প্রদান করেন, যেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পরিবর্তে ‘লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ’ দাবিটি স্থান পায়। এই ৯ দফা ‘এক দফা’ ঘোষণার আগপর্যন্ত আন্দোলনের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে।
২৬ জুলাই বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ভিজিট করতে গিয়ে রিফাত রশিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও মাহিন সরকার সাদাপোশাকের ডিবি পুলিশের ঘেরাটোপে পড়েন। ফোনের চার্জ ফুরিয়ে আসছিল। তিনি আহনাফ সাঈদ খানের মাধ্যমে মানবাধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানের সাথে যোগাযোগ করেন। মুনতাসির বিভিন্ন দূতাবাসে আশ্রয়ের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে জাহাঙ্গীরনগর ছাত্রদলের গাফফার ভাই একটি অ্যাম্বুলেন্স ও পাওয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থা করেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে তারা বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমেরিকান দূতাবাসের পাশে অবস্থান নেন। মুনতাসিরের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার বাংলাদেশ প্রধান রাতের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। পরদিন ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমের সুপারিশে একটি বোর্ডিং স্কুলে আশ্রয় পান। সেখান থেকে অনলাইন প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলন পুনরায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় পরিচালিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং তিন দফা দাবি জানানো হয়।
২৮ জুলাই নেত্র নিউজের সাংবাদিক তাসনীম খলিল জানান, ডিবি অফিসে আটক ছয় সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। রিফাত রশিদ মুহূর্তের জন্য ভেঙে পড়লেও পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত নেন—এই প্রত্যাহার মেনে নেওয়া হবে না। তিনি ফেসবুকে মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি পোস্ট করে জানান, আন্দোলন চলবে। সারা দেশের জনগণ এই ঘোষণার সাথে একাত্মতা জানায়। পরদিন বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তারা একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন—আইডিয়া রিফাত রশিদের, কমিউনিকেশন হান্নান মাসউদ ও কাদের ভাইয়ের। প্রথমে আলোচনা, তারপর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সাথে পৃথক বৈঠক, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সেদিন হাসিনার শোক প্রত্যাখ্যান করে লাল কাপড় বেঁধে কর্মসূচি দেওয়া হয়। ফেসবুক লালে লাল হয়ে যায়—খালেদা জিয়া থেকে ড. ইউনূস পর্যন্ত সবাই প্রোফাইল পিকচার লাল করেন।
রিফাত রশিদের পরিকল্পনায় ছিল সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে হাসিনার পতনের আওয়াজ ফুটিয়ে তোলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাঠে নামানো। তিনি গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন কর্মসূচি দিলে অনেকে আপত্তি জানালেও ছাত্রশিবির সমর্থন দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা সফল হয়। সারা দেশ হাসিনাবিরোধী গ্রাফিতিতে ছেয়ে যায় এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনও জনগণের পক্ষে মাঠে নামে। ২৯ জুলাই আইইউবির শিক্ষিকা আন্দালিব চৌধুরী, তারপর মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন তাদের আশ্রয় দেন। পরে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা ওয়াহিদ ভাই ডিওএইচএস-এ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। ১ আগস্ট ডিবি হেফাজত থেকে সমন্বয়কেরা মুক্ত হন। সিদ্ধান্ত হয়, কাদের ভাই, মাসুদ ভাই, মাহিন ভাই ও রিফাত রশিদের নেতৃত্বেই আন্দোলন চলবে। ২ আগস্ট দ্রোহযাত্রার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দখল করা হয়। সেদিন রাতে শেখ হাসিনার বাহিনী বাসায় বাসায় ঢুকে গুলি চালায়। রিফাত রশিদ সেদিন রাতেই অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। তবে ‘এক দফা’ ঘোষণা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। নাহিদ ইসলাম তাকে এক দফা না ঘোষণার পরামর্শ দেন। ৩ আগস্ট এক দফা ঘোষণার পর ৫ আগস্ট লাখো মানুষের ঢলে হাসিনার পতন ঘটে।
পতনের পর সংবাদ সম্মেলনে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়। রিফাত রশিদ মনে করেন, জুলাইয়ের পর ইতিহাস পাল্টে গেছে, মিডিয়া ন্যারেটিভ দিয়ে নায়ক-মহানায়কের উত্থান হয়েছে। অথচ একমাত্র গুলি খাওয়া অয়নের কথা কজন মনে রেখেছে? শহীদ পরিবার এখনো সাহায্যের জন্য ঘোরে, আহতদের শরীর থেকে বুলেট এখনো বের হয়নি। তিনি বলেন, জুলাইয়ে সবাই ছিল—বিএনপি-জামায়াত, ডান-বাম, ধনী-গরিব, সব ধর্মের মানুষ। কিন্তু বিভাজন সামনে এগোতে দেয়নি। দেশের সংস্কার হয়নি, সবাই ক্ষমতা ভাগাভাগিতেই ব্যস্ত। তবে তিনি আশাবাদী—একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা বুলেটের সামনে খালি হাতে বুক পেতে দাঁড়াতে পারে। এই প্রজন্ম পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় রক্ত দিয়েছে। তারা বেঁচে থাকতে বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদের ফেরার সুযোগ নেই।




