আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগস্ট ২০২৬-এ অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সোমবার সকাল ৬টা ২০ মিনিটে (পূর্বাঞ্চলীয় সময়) ব্রেন্ট বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিক্রি হয়েছে ৯২.৫৪ ডলারে। গতকালের তুলনায় দাম বেড়েছে ৪.৯৯ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বছরের ব্যবধানে হিসাব করলে দাম প্রায় ২৫ দশমিক ৩৮ ডলার বেড়ে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৭৯ শতাংশে।
চলতি মাসের শুরুর দিকের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এক মাস আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৭৬.৫৫ ডলার। সেই হিসেবে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এই দর বৃদ্ধির পেছনে মূলত সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা, সম্ভাব্য মন্দা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধবিগ্রহের মতো ঝুঁকি কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম যে শুধু সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে তা নয়, বরং ভবিষ্যতে সরবরাহ নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক নীতির মতো বিষয়গুলোও দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসন কতটা তেল উত্তোলনের পক্ষে, তাও বাজারের গতিপথ প্রভাবিত করে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের উপকূলীয় সমভূমিতে ১.৫ মিলিয়ন একরেরও বেশি জমিতে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে নীতির পরিবর্তন আনে, যা বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
তেলের দাম কীভাবে পেট্রোলের দামকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। গ্যাস স্টেশনে জ্বালানি কেনার সময় শুধু অপরিশোধিত তেলের দামই দিতে হয় না, বরং পরিশোধন, পাইকারি, কর এবং স্থানীয় ডিলারদের মার্জিনসহ সব খরচ মেটাতে হয়। তবে অপরিশোধিত তেলের দামই পেট্রোলের প্রতি গ্যালনের অর্ধেকেরও বেশি দাম নির্ধারণ করে। তেলের দাম বাড়লে পেট্রোলের দামও দ্রুত বাড়ে, তবে তেলের দাম কমলে পেট্রোলের দাম অনেক সময় ধীরে কমে। এই প্রবণতাকে অনেক সময় 'রকেটস অ্যান্ড ফেদার্স' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
জরুরি মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাংশন, বড় ধরনের ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এমনকি যুদ্ধের মতো সংকটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই রিজার্ভ রাখা হয়। সরবরাহে ধাক্কা লাগলে দাম যাতে অতিরিক্ত বেড়ে না যায়, সেজন্য এসপিআর থেকে তেল বাজারে ছাড়া হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান নয়, বরং স্বল্পমেয়াদে ভোক্তাদের সুরক্ষা এবং জরুরি পরিষেবা, গণপরিবহনসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সচল রাখতে সহায়তা করে।
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের সম্পর্কও নিবিড়ভাবে যুক্ত। তেলের দাম বেড়ে গেলে কিছু শিল্প কার্যক্রমে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে পারে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে তেলের দামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুড মূলত বিশ্বের প্রধান বেঞ্চমার্ক, আর উত্তর আমেরিকার প্রধান বেঞ্চমার্ক হলো ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)। বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের বড় অংশের দর ব্রেন্টের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ায় এটি বিশ্ববাজারের চিত্র তুলে ধরার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) তাদের বার্ষিক এনার্জি আউটলুকে প্রাথমিক রেফারেন্স হিসেবে ব্রেন্টকেই ব্যবহার করে।
ঐতিহাসিকভাবে তেলের দাম বেশ অস্থির ছিল। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ইয়োম কিপুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য রপ্তানি কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে প্রথম বড় মূল্য সংকট দেখা দেয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়া এবং ওপেকের বাইরের দেশগুলোর উৎপাদন বাড়ায় দাম পড়ে যায়। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় দাম আবার চরমে ওঠে, কিন্তু তারপরেই আর্থিক সংকটে ভেঙে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড লকডাউনের সময় চাহিদা নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম ভবিষ্যতে কোন পথে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। যুদ্ধ, মন্দা, ওপেকের সিদ্ধান্ত, শক্তি নীতি পরিবর্তনসহ নানা কারণেই বাজার অস্থির থাকে। দাম নির্ধারণে সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি এসব বিষয়ও প্রতিনিয়ত প্রভাব ফেলছে। এছাড়া প্রতিদিন 'ফিউচার্স' বাজার খোলা থাকাকালীন সময়ে তেলের দাম নিয়মিত পরিবর্তিত হয়, কারণ সেখানে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে তেল কেনাবেচার চুক্তি করে। শেল তেলের উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দামের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে তেলের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ পণ্যের দামও বেড়ে যায়, কারণ পরিবহন খরচ বৃদ্ধির ফলে মুদি দোকান থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দামে তার প্রভাব পড়ে।




