খুলনার কয়রা উপজেলার দশহালিয়া গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধ আবারও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। সম্প্রতি বাঁধটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই কাজই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে অবৈধ পাইপ বসানোর ঘটনা। চার বছর আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর এই বাঁধ ভেঙে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা তৎকালীন সংসদ সদস্যকে কাদা নিক্ষেপ করে তাদের ক্ষোভ জানিয়েছিলেন। পরে সরকারি অর্থায়নে বাঁধটি সংস্কার করে শক্তিশালী করা হয়। কিন্তু ঠিক চার বছরের ব্যবধানে আবার বাঁধে ধস দেখা দেওয়ায় পুরোনো দুর্ভোগ ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে তলিয়ে গেছে। আরও প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দশহালিয়া লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকায় ৭৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যেখানে দরপত্র না দিয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পাশাপাশি ২৪০ মিটার বাঁধের মেরামতি ও মাটি ভরাটের জন্য আরেকটি ২৫ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আমিন অ্যান্ড কোম্পানি’ এই দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
তবে সংস্কার চলা বাঁধের তিনটি স্থানে বড় আকারের পাইপ বসিয়ে চিংড়িঘেরে লোনাপানি তোলা হচ্ছে। এসব পাইপের একটির ওপরের মাটি ধসে একটি খননযন্ত্র আটকে গেছে, অন্যটি মোটা রশি দিয়ে বাঁধা, আর তৃতীয় পাইপের ওপর দিয়ে জিও ব্যাগসহ বাঁধের একাংশ নদীতে ধসে পড়েছে। ভাঙন ঠেকাতে বাঁশের খুঁটি পোঁতা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সোলাইমান হোসেন জানান, কাজ শুরুর আগে বাঁধে থাকা সব অবৈধ পাইপ অপসারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মেরামতির কিছু অংশ শেষ হওয়ার পর ঘেরের মালিকেরা পুনরায় বাঁধ কেটে পাইপ বসিয়ে দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ২৪০ মিটার বাঁধের কাজ শেষ হবে। এ ছাড়া গত শুক্রবার অভিযান চালিয়ে কয়েকটি অবৈধ পাইপ অপসারণ করা হয়েছে এবং বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে সরানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. পলাশ প্রথম আলোকে বলেন, পাইপ অপসারণ না করায় টেকসইভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাঁধের ঢাল বারবার ধসে পড়ছে এবং জিও ব্যাগ বসে যাচ্ছে। নদী ও চিংড়িঘেরের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় মাটির সংকটও দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে নতুন মাটিও দ্রুত সরে যাচ্ছে, যা নিয়মিত মেরামত করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, যেখানে পাইপ থাকে সেখানেই ধস নামে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফাটল দেখা দেওয়ায় তাঁর ধারণা, অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধের আরও বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। অপর বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে কী পরিমাণ দুর্ভোগ হয় তা তাঁরা বারবার দেখেছেন। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে লোনাপানির ঘের চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্প এলাকায় কাজের কোনো সাইনবোর্ড নেই এবং কাজের মানও সন্তোষজনক নয়।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, সম্প্রতি মাইকিং করে বাঁধ ছিদ্র না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবার তাঁরা কঠোর অবস্থানে যেতে চান এবং যারা অবৈধভাবে বাঁধ কেটে পানি তুলছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী বেড়িবাঁধ কেটে বা ছিদ্র করে যত্রতত্র লোনাপানি প্রবেশ করানো নিষিদ্ধ। নির্ধারিত কাঠামোর মাধ্যমেই পানি নেওয়ার বিধান রয়েছে এবং ঘেরমালিকদেরই বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনের কথা। কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঘেরমালিক জানান, লবণাক্ত জমিতে অধিকাংশ সময় ফসল হয় না এবং মিঠাপানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় চিংড়ি চাষই তাদের মূল আয়ের উৎস। তাই তারা বাধ্য হয়েই বাঁধে পাইপ বসান।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, অবৈধ পাইপ অপসারণের ঘোষণা বহুবার দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে প্রতিবছর সরকারি অর্থে বাঁধ সংস্কার হলেও ঘেরমালিকেরা নির্বিঘ্নে আবার পাইপ বসিয়ে দিচ্ছেন। এতে ভাঙনের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে এবং এলাকাবাসীর দুর্ভোগেরও শেষ হচ্ছে না।




