বনের রাজা হিসেবে সিংহের খ্যাতি থাকলেও আফ্রিকার তৃণভূমির বন্য প্রাণীদের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম কিন্তু মানুষ। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে, স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর মানব প্রভাব কতটা গভীর ও ক্ষতিকারক, এবং প্রাণীরা কীভাবে মানুষকে তাদের প্রধান শিকারি হিসেবে চিহ্নিত করে।
সায়েন্স অ্যালার্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রেটার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কে এই সংক্রান্ত একটি পরীক্ষা চালানো হয়। ওই পার্কটি বিশ্বের বৃহত্তম সিংহ জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। গবেষক দলটি সেখানকার পানির উৎসগুলোর পাশে বিভিন্ন ধরনের অডিও রেকর্ডিং বাজিয়ে প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। এই রেকর্ডিংগুলোর মধ্যে ছিল সাধারণ মানুষের কথোপকথন, শিকারের সময়কার শব্দ যেমন বন্দুকের গুলি ও কুকুরের ঘেউ ঘেউ, এবং সেই সাথে সিংহের গর্জন ও হুংকার। ঘটনাস্থলে মোশন-ট্রিগারড ক্যামেরা স্থাপন করে প্রাণীদের আচরণ রেকর্ড করা হয়।
ফলাফল অত্যন্ত চমকপ্রদ ছিল বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। হাতি, গন্ডার, জিরাফ, জেব্রা, চিতা বাঘ, হায়েনা ও বুনো শূকরসহ মোট ১৯টি স্তন্যপায়ী প্রজাতির ওপর নজর রাখা হয়েছিল। দেখা গেছে, প্রায় সব প্রজাতির প্রাণীই সিংহের গর্জন কিংবা শিকারের শব্দের তুলনায় মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে দ্বিগুণ গতিতে পালিয়ে যায়। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে বন্য প্রাণীরা মানুষকেই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সংরক্ষণ বিজ্ঞানী মাইকেল ক্লিনচি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষের প্রতি এই ভয় প্রাণীদের মনে গভীরভাবে প্রোথিত এবং তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি যেসব সুরক্ষিত এলাকায় শিকার পুরোপুরি নিষিদ্ধ, সেখানকার প্রাণীরাও কখনো মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হতে পারে না। গবেষক দলটি আরও জানান, অস্ট্রেলিয়াতেও একই ধরনের আচরণ লক্ষ করা গেছে। সেখানে ক্যাঙারু এবং অন্যান্য মার্সুপিয়াল (থলিযুক্ত প্রাণী) জাতীয় প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক শিকারিদের চেয়ে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে অনেক বেশি তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছিল।
এই গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করে যে বিভিন্ন মহাদেশের বন্য প্রাণীরা সম্মিলিতভাবে মানুষকেই এই গ্রহের প্রকৃত প্রধান শিকারি হিসেবে চিহ্নিত করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহারিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে এবং সংরক্ষণ কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

