বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ সংস্থা এডেলম্যানের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড এডেলম্যান দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকানদের আস্থার স্পন্দন অনুধাবন করে আসছেন। তাঁর সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ বলছে, মার্কিন নাগরিকরা এখন নিজেদের মতাদর্শগত ঘেরাটোপে আবদ্ধ করে ফেলছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৪২ শতাংশ কর্মী নিজের থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের বসের অধীনে কাজ করার চেয়ে বিভাগ পরিবর্তন করতে বেশি আগ্রহী। অধিকাংশ মানুষ এখন কেবল সেই সংবাদ মাধ্যম থেকে তথ্য নিচ্ছেন যা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিধ্বনি করে। সম্প্রতি নিউইয়র্কে এডেলম্যানের বার্ষিক ট্রাস্ট সামিটে এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সেখানে নেতাদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্ন এই পৃথিবীতে কীভাবে আস্থা পুনর্গঠন করা যায়? আলোচনা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে।
প্রথমত, সাধারণ ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসঙ্গে কর্মীদের আলোচনায় যুক্ত করতে হবে। অনেক সিইও শুধু প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন; কিন্তু কর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তারা তেমন গুরুত্ব দেন না। মানুষের মন বদলানোর চেষ্টা না করে শোনার ওপর নজর দিতে হবে। এআই কীভাবে কর্মক্ষেত্রকে কেবল উৎপাদনশীল নয়, বরং আনন্দদায়ক করে তুলতে পারে—সে বিষয়ে ভাবতে হবে। ফিফা বিশ্বকাপ ও সাম্প্রতিক এনবিএ ফাইনাল ক্রীড়ার শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে একটি ফাস্টফুড চেইনের ডানপন্থী সিইও ও অভিবাসী শ্রমিকদের বামপন্থী সংগঠকের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্ব নিয়ে যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল, তা দেখিয়ে দেয় সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, সৎ মধ্যস্থতাকারী খুঁজে বের করতে হবে। তারাই হলেন সেই সামাজিক সংযোগকারী ও গোষ্ঠী যারা সম্প্রদায়ে বিনিয়োগ করে, সেই ম্যানেজাররা যারা স্বচ্ছ এবং কর্মীদের আস্থাভাজন। মধ্যম ব্যবস্থাপকের শক্তিকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়। প্রকৃত শ্রদ্ধা ও কৌতূহলের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে—স্পষ্ট মূল্যবোধ থাকলেও পার্থক্যের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। প্রতিবেশীদের চেনা এবং মানুষ হিসেবে সংযোগ স্থাপন করা জরুরি। মিনেসোটায় অভিবাসন ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের (আইসিই) অভিযানের বিরুদ্ধে যে বড় আকারের প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা সম্প্রদায়ের শক্তির প্রমাণ। এটি বাম-ডানের জয় নয় বরং নাগরিকরা নিজেদের প্রতিবেশী, সহকর্মী ও বন্ধুদের পক্ষে দাঁড়ানোর জয়। আমেরিকানরা প্রতিবেশীপ্রিয় মানুষ।
তৃতীয়ত, স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে শুরু করে যোগাযোগ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা আস্থা তৈরির শক্তিশালী হাতিয়ার। মানুষ নিজের নিয়োগকর্তাকে অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে, যা কর্মস্থলকে তথ্য আদান-প্রদানের শক্তিশালী মাধ্যম করে তোলে। তবে এডেলম্যানের বৈশ্বিক জরিপে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে সিইওরা চাকরি ছাঁটাইয়ের বিষয়ে সৎ নন। স্বচ্ছতা সমস্যার দিকও নির্দেশ করতে পারে। বেতন স্বচ্ছতা সিইও ও কর্মীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য উন্মোচন করে, যা রক্ষা করা কঠিন।
চতুর্থত, বহুজাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে 'পলিন্যাশনাল' হতে হবে। শুধু আমেরিকা নয়, উৎপাদন, ভোগ, রপ্তানি ও অভিবাসনের মতো ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। এডেলম্যানের মতে, উন্নত বাজারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ নিজ দেশে তৈরি পণ্য কিনতে পছন্দ করেন—২০২৩ সালের তুলনায় এই হার পাঁচ শতাংশ বেড়েছে। শুল্ক, যুদ্ধ, বক্তব্য বা আমেরিকার অন্যান্য পদক্ষেপের কারণে এই প্রবণতা গর্ব নাকি ক্রোধ থেকে আসে, তা বিবেচ্য নয়। বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন বাজারে সফল হতে চাইলে কোম্পানিগুলোকে বিকেন্দ্রীভূত হতে হবে এবং সেসব বাজারে সত্যিকারের স্থানীয় খেলোয়াড়ে পরিণত হতে হবে। ফরচুনের সিইও ডেইলির প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।

