প্রাগৈতিহাসিক বিশ্বের এক অসাধারণ নিদর্শন আগামী মঙ্গলবার নিলামে তোলা হবে। এটি একটি টাইরানোসরাস রেক্সের প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কাল, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গাস’। ১৯৯৭ সালে সোথেবি’র এক নিলামে ‘সু’ নামের আরেকটি টি. রেক্স ৮ মিলিয়ন ডলারে শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামে বিক্রি হয়েছিল। সেই সময় নিলামটি ছিল মূলত জাদুঘরগুলোর জন্য একটি বিশেষ আয়োজন। কিন্তু প্রায় ৩০ বছর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন অতি-ধনী ব্যক্তিরাও ডাইনোসরের সন্ধানে নেমেছেন, ফলে দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে।
গাসের প্রাক-নিলাম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি ডলার। তবে এটি আরও বেশি দামে বিক্রি হতে পারে, এমনকি সর্বকালের সবচেয়ে দামি ডাইনোসর জীবাশ্ম হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান রেকর্ডটি ২০২৪ সালে সোথেবি’তে বিক্রি হওয়া স্টেগোসরাস ‘অ্যাপেক্স’-এর, যার মূল্য ছিল ৪৪.৬ মিলিয়ন ডলার। তবে সেটি তার প্রাক-নিলাম মূল্যের ১১ গুণ দামে বিক্রি হয়েছিল। গাসের জন্য সর্বনিম্ন দর শুরু হবে ১.৯ কোটি ডলার থেকে, যা অনেক বড় জাদুঘরের কাছেও নাগালের বাইরে।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ডাইনোসর গবেষক অধ্যাপক সুসান্না মেইডমেন্ট জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই অনেক জাদুঘর মূল্যবান নমুনা সংগ্রহ করার সামর্থ্য হারিয়েছে। ২০২০ সালের পর থেকে নিলামে বিক্রি হওয়া পাঁচটি সবচেয়ে দামি ডাইনোসরের সবকটিই ব্যক্তিগত ক্রেতার কাছে গেছে। তিনি এটিকে ‘সত্যিই সমস্যাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, প্রকৃত জীবাশ্মের কোনো বিকল্প নেই; শারীরস্থান বোঝার জন্য বাস্তব নমুনা অপরিহার্য। আর প্যালিওবায়োলজি—পৃথিবীর অতীত জীবন নিয়ে অধ্যয়ন—বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বর্তমান গণবিলুপ্তির সময়ে।
সোথেবি’র প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান ক্যাসান্ড্রা হ্যাটন জানান, গাসের হাড়ের অবস্থা থেকে এই প্রাণীর জীবন সম্পর্কে গভীর তথ্য পাওয়া যায়। মাথার খুলির ওপর একটি বড় কামড়ের চিহ্ন রয়েছে, যা সম্ভবত কোনো যুদ্ধের সময় লেগেছিল। পাঁজরের হাড় ভেঙে সেরে ওঠার চিহ্নও দেখা যায়। তিনি আরও বলেন, গাস এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় ও সম্পূর্ণ টি. রেক্সগুলোর একটি—এর ৬১ শতাংশ হাড় শনাক্ত করা গেছে, যা একটি বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
তবে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন যে এই ধরনের নমুনা ব্যক্তিগত হাতে চলে গেলে গবেষণার জন্য তা হারিয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে সম্মানিত বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা নমুনার ওপর করা গবেষণা গ্রহণ করে না। কারণ গবেষকদের বছরের পর বছর ধরে সেই জীবাশ্ম পুনরায় পরীক্ষা করার সুযোগ থাকতে হবে। অধ্যাপক মেইডমেন্টের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা নমুনা মালিকের আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, মৃত্যু বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, জীবাশ্ম শিকারিদের যুক্তি হলো তাদের আবিষ্কার ও সংরক্ষণের জন্য মুনাফা অর্জন জরুরি। ক্যাসান্ড্রা হ্যাটন বলেন, বেশিরভাগ খননকারী ধনী নন; তারা নিজেদের টাকা বিনিয়োগ করে ঝুঁকি নিয়ে জীবাশ্ম উদ্ধার করেন। স্বাধীন প্যালিওন্টোলজিস্ট ড. ফিয়ান স্মিথউইক, যিনি পেশাগতভাবে জীবাশ্ম সংগ্রহ ও বিক্রি করেন, তিনি বলেন যে জাদুঘরও নমুনা হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। তিনি ইংল্যান্ডের জুরাসিক উপকূলে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবাশ্ম রক্ষার কথা উল্লেখ করেন।
সব পক্ষই একমত যে পেশাদার শিকারিদের কাজ ও দক্ষতা ছাড়া কোনো জীবাশ্মই উদ্ধার করা সম্ভব হতো না। সোথেবি’র হ্যাটনের ভাষায়, তারা ডাইনোসরকে দ্বিতীয় বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করছেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই অমূল্য বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলি কি কেবল ধনীদের শো-পিস হবে, নাকি জনসাধারণের জ্ঞানের জন্য জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকবে?




