কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে জেন জি প্রজন্মের ওপর। বিভিন্ন শিল্পে নবীন কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ এখন উচ্চদক্ষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ কর্মীদের খুঁজছেন। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই জেন জি প্রজন্ম তাদের কর্মজীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করছে। অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি-র ৯০০-এর বেশি গ্রীষ্মকালীন ইন্টার্নের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পূর্ণকালীন চাকরি বাছাইয়ের সময় জেন জি-র কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্যারিয়ার বৃদ্ধি। এই প্রজন্মের কাছে কাজ-জীবনের ভারসাম্য, বেতন, কর্মসংস্থানের সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির সাথে তাল মেলানো—এসবের চেয়ে ক্যারিয়ার অগ্রগতি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু প্রথম চাকরি বা পদোন্নতি পাওয়া নয়, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৩ শতাংশই জানিয়েছেন, তারা তাদের কর্মজীবনে শীর্ষ নির্বাহী পদ (সি-স্যুইট) বা জ্যেষ্ঠ নির্বাহী স্তরে পৌঁছানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। তবে কেপিএমজি বলছে, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য শুধু কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেই হবে না; বরং এমন দক্ষতা অর্জন করতে হবে যা একজন কর্মীকে বিনিয়োগের যোগ্য করে তোলে।
কেপিএমজি ইউএস-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিভা অধিগ্রহণের জাতীয় অংশীদার ডেরেক টমাস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, “জেন জি ঝুঁকিটি স্পষ্টভাবে দেখছে। শুরু থেকেই যদি সব চিন্তাভাবনার জন্য এআই-এর ওপর ভরসা করা হয়, তাহলে কখনোই সেই সহজাত বোধ তৈরি হবে না যা একজন শক্তিশালী কর্মীকে গড়ে তোলে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তারা সেই কাজের পুনরাবৃত্তি (রেপস) রক্ষা করছে, হাতেকলমে কাজ যা প্রকৃত মানবিক দক্ষতা তৈরি করে, কারণ তারা জানে এটাই একজন নবীন কর্মীকে এমন কেউ হয়ে ওঠায় যাকে বিকশিত করা ও বিনিয়োগের যোগ্য মনে করা হয়।” বিস্তৃত জরিপগুলিতে দেখা গেছে, জেন জি কর্মীদের কাছে কাজ-জীবনের ভারসাম্য একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার। তবে কেপিএমজি-র এই ফলাফল প্রজন্মটির উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। বর্তমান কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতি উপলব্ধি করে অনেক তরুণ পেশাজীবী কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে ওঠার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।
শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছানোর আর্থিক ফলাফলও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাজ্যে কেপিএমজি-র অংশীদাররা ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮৮০,০০০ পাউন্ড (প্রায় ১২ লাখ ডলার) আয় করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এএফএল-সিআইও-র তথ্যমতে, ২০২৪ সালে গড়ে একজন এসএন্ডপি ৫০০-এর প্রধান নির্বাহী ১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার আয় করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি।
এআই কর্মক্ষেত্রের একটি বড় অংশ হয়ে ওঠায় জেন জি একটি নতুন ক্যারিয়ার সমীকরণ সমাধানের চেষ্টা করছে: প্রযুক্তিটিকে কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়া যায়। জরিপে অংশ নেওয়া ইন্টার্নরা মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরে নবীন কর্মীদের আলাদা করবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি। মোট ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার সাফল্যের জন্য শক্তিশালী মানবিক দক্ষতা এবং এআই এজেন্টদের কার্যকরভাবে পরিচালনার ক্ষমতা—দুটোই প্রয়োজন। একইসঙ্গে, জেন জি প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়া নিয়ে সতর্ক। ৪০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা বলেছেন, তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো এআই-এর ওপর অতিনির্ভরতা সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ডেরেক টমাস আরও বলেন, “আপনি ভাববেন, আমরা এখন পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া সবচেয়ে ডিজিটালি সচেতন প্রজন্মটিই বলবে প্রযুক্তিই তাদের শক্তি। কিন্তু তারা আমাদের বলছে, সমালোচনামূলক চিন্তা, বিচারবুদ্ধি এবং যোগাযোগ দক্ষতাই তাদের আলাদা করে তুলবে।” তার মতে, নিয়োগকর্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু কর্মীদের এআই ব্যবহার শেখানো নয়; বরং সেই মানবিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ, যা এআই যুগে আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে।
জ্যামি ডিমন, অ্যান্ডি জ্যাসি-র মতো প্রধান নির্বাহীরাও একমত যে, মানবিক দক্ষতাই এআই যুগে জয়ী-পরাজিত নির্ধারণ করবে। ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এর তারকা ও কেআইএনডি বার-এর প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল লুবেটস্কি জেন জি-কে প্রযুক্তি সহজে অনুকরণ করতে পারে না এমন দক্ষতার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ফরচুনকে বলেন, “সমালোচনামূলক চিন্তকের চাহিদা এখন বেশি, এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এআই বাস্তব, কিন্তু মানুষের মতো সৃজনশীলতা তার নেই। তরুণরা যদি কৌতূহল, সমালোচনামূলক চিন্তা ও সৃজনশীলতার ওপর জোর দেয়, তাহলে তারাই জিতবে।” জেপিমরগান চেজের প্রধান নির্বাহী জ্যামি ডিমনও একই বার্তা দিয়েছেন। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, “আমার পরামর্শ হলো, সমালোচনামূলক চিন্তা শিখুন, দক্ষতা অর্জন করুন, আপনার ইকিউ (আবেগিক বুদ্ধিমত্তা) বাড়ান, সভায় ভালো থাকতে শিখুন, যোগাযোগ ও লেখালেখিতে দক্ষ হোন। তাহলে আপনার কাছে প্রচুর কাজ থাকবে।” ফরচুন ৫০০-এর শীর্ষ কোম্পানি অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি একই মত পোষণ করেছেন। তিনি তার শেয়ারহোল্ডারদের চিঠিতে লিখেছেন, “আমরা ক্রমাগত ‘কেন’ এবং ‘কেন নয়’ প্রশ্ন করি। এটি আমাদের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে, মূল কারণ খুঁজে বের করতে, বাধাগুলো বুঝতে এবং সেই দরজাগুলো খুলতে সাহায্য করে যা আগে দুর্ভেদ্য মনে হতো।”



