একটি মাটির উঠোন, চুলায় আগুন, পাশে টাটকা মাছ, লাউ ও কাঁচা মরিচ—এই দৃশ্যই যেন থামিয়ে দেয় লক্ষ লক্ষ দর্শককে। রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের হরগোবিন্দ গ্রামের বাসিন্দা রাহেদুল ইসলাম, যিনি 'নাহিদ অফিসিয়াল' নামে ফেসবুকে পরিচিত, এখন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় গ্রামীণ কনটেন্ট নির্মাতা। তাঁর ফেসবুক পেজে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর ভিডিওর মোট ভিউ একশ কোটিরও বেশি। অনেকে তাঁকে 'ড্যান্সিং কুক' নামেও চেনেন, কারণ তাঁর প্রতিটি রান্নার ভিডিওতে হাঁড়ি ধোয়া, সবজি কাটা, মসলা বাটা বা মাটির চুলায় আগুন জ্বালানো—সবকিছুতেই থাকে এক অদ্ভুত নৃত্যছন্দ।

১৯৯৭ সালে জন্ম নেওয়া রাহেদুলের বাবা আবদুস সামাদ এলাকার একটি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন। দাদার রেখে যাওয়া ২৫ বিঘা জমি ভাগে পেয়েছিলেন তাঁরা। তবে তাঁর জন্মের পরই পরিবারের ভাগ্য বদলে যায়। মা সুফিয়া বেগম একটি দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ছোট রাহেদুলকে বড় করেন দাদি সোবাতন নেছা। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ জোগাতে বাবা একে একে বিক্রি করে দেন সব পৈতৃক সম্পত্তি। ২০১৫ সালে, রাহেদুলের বয়স যখন ১৮ বছর, তখন তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, শুধু বসতভিটা। বড় ভাই সুমনের আয় ও বাবার মসজিদের মুয়াজ্জিনের সামান্য বেতন দিয়ে কোনোমতে চলত সংসার। একপর্যায়ে পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অনেক কষ্টে বাবার সেই সামান্য আয় দিয়েই আবার পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।

অভাব, অবহেলা ও বৈষম্য তাঁকে ভেতর থেকে পোড়ালেও ছোটবেলা থেকেই গান, নাচ ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করার পর, বছরের শেষ দিকে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। ভর্তি হন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। প্রথমে খালার বাসায় আশ্রয় মেলে, কিন্তু সেখানেও অস্বস্তি তৈরি হয়। পরে এক সরকারি কর্মকর্তার সাহায্যে কয়েক মাস আর্থিক সহায়তা পান এবং ধীরে ধীরে টিউশনি জোগাড় করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানো শুরু করেন। সেই সময় তিনি নিজের রান্নাও নিজেকেই করতে বাধ্য হতেন, কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না যে এই রান্নাঘরই একদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠবে।

২০২৩ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, শুধু রান্না নয়; বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও হারিয়ে যেতে বসা জীবনযাপনকে ক্যামেরায় ধারণ করবেন। টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেন ভিডিও নির্মাণ। ২০২৪ সালে বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেননি তিনি। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকেও তেমন সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবে বাবাকে হারান। সেই শোকের মধ্যেই অদ্ভুত এক মোড় নেয় তাঁর জীবন। একের পর এক ভাইরাল হতে থাকে তাঁর রান্নার ভিডিও। বর্তমানে কনটেন্ট নির্মাণই তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। যে ছেলে একদিন বাবার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারেননি, আজ তিনিই পরিবারের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

রাহেদুলের সাফল্যের পেছনে রয়েছে ভরতনাট্যম নাচের প্রশিক্ষণ। ছায়ানটে শেখা সেই শাস্ত্রীয় নৃত্যের তাল, লয় ও নিখুঁত অঙ্গভঙ্গিই তাঁর রান্নার ভিডিওকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, 'রাহেদুলের ভিডিওর শুরুতে রান্না হয় না; প্রথমে উঠান ঝাড়ু দেওয়া, হাঁড়িপাতিল ধোয়া, মাটির মেঝে লেপা—এই প্রস্তুতিও দারুণ আকর্ষণ। দেখলে গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে।' কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল হামিদ বলেন, রাহেদুল শুধু একজন কনটেন্ট নির্মাতা নন, তিনি এলাকার গর্ব। তিনি তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা।

তবে সাফল্যের পথ মসৃণ ছিল না। একদিন তাঁর ইউটিউব চ্যানেল হ্যাকড হয়। বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা ভিডিও, দর্শক ও আয়ের উৎস—সবকিছু মুহূর্তে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে চ্যানেল ফিরে পেলেও তিনি বিশ্বাস করেন, ওই ঘটনায় তিনি অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েও তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় হলো, আবার যদি তাঁর ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল হ্যাকড হয়। কারণ, এই আয়েই তো চলে তাঁর ১০ সদস্যের পরিবার। ছোটবেলার দারিদ্র্য আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। আর কখনো যেন সেই অভাবের দিনগুলো ফিরে না আসে—সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন আবার জ্বলে ওঠে তাঁর মাটির চুলা, আর নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের হৃদয়ে।