রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের বুক চিরে বয়ে চলা নেভা নদী। বাংলাদেশের হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই নদীটি এক বাংলাদেশি গবেষকের যৌবনের চারটি বছর নীরব সহযাত্রী হয়ে উঠেছিল। আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার ও ডরমিটরির ব্যস্ততার মাঝে নেভা ছিল তার একান্ত সঙ্গী। প্রথম দিকে জানালার বাইরে দেখা একটি নদী মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার পথে, বাসের জানালা দিয়ে বা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কখনো কখনো কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকতেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে একটি অভ্যাস তৈরি হয়। দিনের কাজ শেষে পা আপনাতেই চলে যেত নেভার তীরের দিকে। কোনো কথা না বললেও মনে হতো, এই নীরবতার একটি ভাষা আছে। গবেষণাগারে সাফল্য বা ব্যর্থতা, বাংলাদেশ থেকে আসা চিঠি, প্রিয়জনের স্মৃতি—সব কিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে উঠল নদীটি। নভেম্বরের শেষে শীত এসে হাজির হয়। এক সকালে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখেন, গতকাল যেখানে কালচে নীল জল ছিল, সেখানে আজ সাদা বরফের বিস্তার। সেই শীতে নেভাকে নতুন করে চিনলেন তিনি। বরফে ঢাকা পড়লেও নদী অস্থির হয় না। ভেতরে তার স্রোত অবিরাম বয়ে চলে। এখান থেকে শিক্ষা নিলেন—মানুষের জীবনেও এমন শীত আসে, বুকের ওপর জমে থাকা বরফের নিচেও জীবনের প্রবাহ থেমে থাকে না। গবেষণার দিনগুলো সবসময় সমান ছিল না। কোনো পরীক্ষায় দীর্ঘদিনের শ্রম মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে যেত। এমন এক সন্ধ্যায় হতাশ মন নিয়ে নেভার তীরে বসে দেখলেন, তার স্রোত কোথাও ঘূর্ণি, কোথাও বাঁক নেয়, কিন্তু থেমে থাকে না। মনে হলো, নদী নীরবে বলছে—গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ সব সময় সোজা হয় না, গুরুত্বপূর্ণ হলো চলে যাওয়া। আরেক সময় দীর্ঘদিন দেশের কারও খবর না পেয়ে অপেক্ষার সন্ধ্যাগুলো কাটিয়েছেন নেভার তীরে। নদীর জলে ছোট ছোট তরঙ্গ উঠত, মিলিয়ে যেত, আবার ফিরে আসত। তখন মনে হয়েছিল, অপেক্ষাও নদীর ঢেউয়ের মতো। মে মাসের শেষে তিনি লক্ষ করলেন, সন্ধ্যা যেন শেষ হতে চায় না। রাত ১০টায় জানালার পাশে বসে গবেষণাপত্র পড়ার সময় বাইরে ম্লান আলো দেখে বুঝতে পারলেন, ‘হোয়াইট নাইটস’ কোনো কল্পকাহিনি নয়—এটি প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়। পরদিন রাতে পা চলে গেল নেভার তীরে। সেখানে পৌঁছে মনে হলো, পৃথিবী যেন আলো আর জলের মাঝখানে থেমে আছে। রুপালি আলো নদীর বুকে পড়ে হাজারো কাঁপতে থাকা আলোকরেখায় ভেঙে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে নেভা যেন তাকে বলছে—অন্ধকার সব সময় রাতের পরিচয় নয়, কখনো কখনো আলোও নিঃসঙ্গ হতে পারে। জুন মাসের প্রায় প্রতিটি রাতই কাটিয়েছেন নেভার তীরে। সারা দিন গবেষণাগারের সূক্ষ্ম জগতের পর রাতের এই হাঁটাগুলো ছিল মানসিক মুক্তির সময়। নদীর তীর তখন প্রাণবন্ত থাকে—কোথাও তরুণদের গিটার ও গান, কোথাও কোনো শিল্পী ক্যানভাসে নেভার ছবি আঁকছেন, কোথাও প্রেমিক-প্রেমিকা নীরবে বসে আছেন। সেই দৃশ্য শহরের মানুষের কাছে প্রতিবছরের পরিচিত হলেও তার মতো এক বাংলাদেশি গবেষকের কাছে এটি এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা ছিল। সেখানেই তিনি শিখেছিলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্যের সামনে মানুষের জাতীয়তা, ভাষা বা পরিচয়ের ভেদরেখা মিলিয়ে যায়। রাত গভীর হলে সেতুগুলো ধীরে ধীরে ওপরে উঠত, সাইরেন বেজে উঠত, ইস্পাতের বিশাল কাঠামো দুই দিকে খুলে যেত এবং নীলাভ আলো ভেদ করে বিশাল জাহাজ এগিয়ে আসত। মনে হতো, মানুষ আর প্রকৃতি প্রতি রাতে মিলে যেন এক অনবদ্য নাটক মঞ্চস্থ করছে। এই রাতগুলোয় তিনি প্রায়ই একা হাঁটতেন। এক রাতে মনে হলো, আজ যদি প্রিয় মানুষটি এখানে থাকত! বুকের ভেতর নিঃশব্দ এক হাহাকার জেগে উঠল। নেভার দিকে তাকিয়ে অবিরাম প্রবাহ তাকে মনে করিয়ে দিল—দূরত্ব ভালোবাসাকে কমায় না, নদীর দুই তীর আলাদা হয়েও একই জলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। সেই উপলব্ধির পর আর কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে হয়নি। ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলেন, হোয়াইট নাইটসের প্রকৃত বিস্ময় এই নয় যে রাতেও আলো থাকে, বরং তা মানুষের অন্তরের অন্ধকারকেও ধীরে ধীরে আলোকিত করে। চার বছরের প্রতিটি ঋতু—প্রথম শীত, প্রথম সাফল্য, ব্যর্থতা, অপেক্ষা, আনন্দ, বিষণ্নতা—সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিল নেভা। অবশেষে বিদায়ের দিন এল। যে শহরে প্রথম এসেছিলেন এক অচেনা গবেষক হিসেবে, সেই শহরই অজান্তে তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। সেন্ট পিটার্সবার্গ ছেড়ে যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় শেষবারের মতো নেভার তীরে গেলেন। পরিচিত বেঞ্চটিতে বসলেন। এখানেই কত সন্ধ্যা কেটেছে—হাতে গবেষণাপত্র, বাংলাদেশের চিঠি, প্রিয়জনের স্মৃতি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, গভীর নিঃসঙ্গতা। দীর্ঘক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো, চার বছরের প্রতিটি দিন যেন নেভার জলের ওপর ভেসে উঠছে। তখন উপলব্ধি করলেন, মানুষের জীবনে এমন কিছু স্থান থাকে, যেখানে সে শুধু সময় কাটায় না, নিজের একটি অংশ রেখে আসে। নেভার তীরে তিনি রেখে গেলেন যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান চারটি বছর, একজন বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার প্রথম স্বপ্ন, প্রথম একাকিত্ব ও প্রথম আত্ম-আবিষ্কারের দিনগুলো। মনে মনে বললেন, ‘ধন্যবাদ’—নিঃসঙ্গতার দিনগুলোয় নীরবে পাশে থাকার জন্য, ধৈর্য শেখানোর জন্য, বোঝানোর জন্য যে বরফের নিচেও নদী বয়ে চলে। নেভা কোনো উত্তর দিল না। নদীরা কখনো শব্দে উত্তর দেয় না; তাদের উত্তর লুকিয়ে থাকে প্রবাহে। হালকা বাতাস বইল, নদীর বুকে ছোট ছোট ঢেউ উঠল, অস্তগামী সূর্যের আলো সেই ঢেউয়ের ওপর ভেঙে অসংখ্য সোনালি রেখায় ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, নেভা তার নিজস্ব ভাষায় শেষবিদায় জানাল। আজ পৃথিবীর বহু নদীর তীরে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছে—পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ভলগা, স্প্রি, টেমস। প্রতিটির নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। কিন্তু নেভা তার কাছে শুধু একটি নদী নয়; সে তার যৌবনের নীরব সহযাত্রী, একাকিত্বের শ্রোতা, স্বপ্নের রক্ষক। কিছু সম্পর্ক পরিচয়ে গড়ে ওঠে, কিছু সময়ের সঙ্গে। আর কিছু সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক শুরুই থাকে না; একদিন হঠাৎ মানুষ বুঝতে পারে, তার নীরবতারও একজন শ্রোতা আছে। তার জীবনে নেভা নদী ঠিক তেমনই এক অনুচ্চারিত, অথচ চিরন্তন সহযাত্রী। লেখাটি সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশিদুল হকের।
নেভা নদী: বিজ্ঞানীর যৌবনের নীরব সাক্ষী ও সেন্ট পিটার্সবার্গে কাটানো চার বছর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রাশিদুল হক আশির দশকে সেন্ট পিটার্সবার্গে গবেষণাকালে নেভা নদীর সঙ্গে গড়ে ওঠা নীরব বন্ধন, শীত, হোয়াইট নাইটস ও আত্ম-আবিষ্কারের স্মৃতিচারণ করেছেন।



