বেসরকারি খাতের ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পূর্ণ করেছে ঢাকা ব্যাংক। ব্যাংক খাতের নানা সংকটের মধ্যেও এই ব্যাংক ধরে রেখেছে তার নিজস্ব অবস্থান ও স্থিতিশীলতা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির তিন দশকের বেশি সময়ের যাত্রাপথ, বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ওসমান এরশাদ ফয়েজ।
ঢাকা ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই করপোরেট ব্যাংকিংয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ওসমান এরশাদ ফয়েজ জানান, ১৯৯৩ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেসে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশ কার্যক্রম পরিচালনার পর প্রায় দুই দশক সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন। বৈশ্বিক ফিনটেক অভিজ্ঞতা ও ঢাকা ব্যাংকের করপোরেট ব্যাংকিং সক্ষমতার সমন্বয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমার লক্ষ্য হলো, এই সক্ষমতা ধরে রেখে আরও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা, যাতে বিদ্যমান সম্পর্কগুলো আরও কার্যকর হয়, সেবার গতি বাড়ে এবং গ্রাহকসেবা সাশ্রয়ী হয়।" তিনি মনে করেন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের একমাত্র যৌক্তিকতা হলো গ্রাহকের অভিজ্ঞতার উন্নতি ঘটানো। ইতিমধ্যে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে জেপি মর্গানের পেমেন্ট অবকাঠামো যুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পরিবারের কাছে পৌঁছায়।
দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও তারল্য চাপ মোকাবিলায় ঢাকা ব্যাংকের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, "আমরা দেখছি, প্রায় দুই বছর দেশের ব্যাংকিং খাত তারল্য চাপে রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংকের সংকট এই খাতে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। ফলে অনেক আমানতকারী তাঁদের অর্থ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন।" ঢাকা ব্যাংক এই সংকটে আস্থার সুবিধাভোগী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। গত বছর তাদের নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ছিল ১১৯ শতাংশ এবং তারা বিনিয়োগকারীদের নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, শৃঙ্খলার অভাবই সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর অন্যতম দুর্বলতা ছিল, তাই ঢাকা ব্যাংক আর্থিক স্থিতিপত্র পরিচালনা করে সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সামনে রেখে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণকে তিনি সমর্থন করেন। তার মতে, "পরিস্থিতি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত অপরিহার্য।" যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কাঠামোতে ধরে রাখা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, মালিকদের অপব্যবহারের কারণে সংকটে পড়া ব্যাংকের মালিকানাগত কাঠামো পরিবর্তন হওয়া উচিত।
খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নে ঢাকা ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সম্পর্কে এমডি বলেন, "সাম্প্রতিক বৃদ্ধি অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক মান অনুসারে কঠোরভাবে ঋণ শ্রেণিকরণের ফল।" তিন মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলেই ঋণকে নিম্নমান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার নিয়ম বাস্তবায়নের ফলে আগের লুকানো দুর্বলতাগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। ঢাকা ব্যাংক ঋণ প্রদানে একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সীমা নির্ধারণ করেছে এবং জামানতের চেয়ে নগদ প্রবাহকে প্রধান মূল্যায়ন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করছে। তাদের লক্ষ্য এমন একটি ঋণ পোর্টফোলিও গঠন করা, যেখানে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি কম।
আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে ঢাকা ব্যাংক উচ্চ সুদের পথ অনুসরণ না করে তুলনামূলকভাবে কম খরচের চলতি ও সঞ্চয়ী আমানতের ভিত্তি পুনর্গঠন করছে। ওসমান এরশাদ ফয়েজের মতে, "আমানতকারীরা শেষ পর্যন্ত সেই ব্যাংকের দিকেই ঝোঁকেন, যেটিকে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ ও স্থিতিশীল মনে করেন।" তাই তাদের লক্ষ্য আস্থার অবস্থান আরও দৃঢ় করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে তিনি মনে করেন, এই নীতিসহায়তা অর্থনীতিকে স্বস্তি দেয়, তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে তহবিলের ব্যবহার কতটা উৎপাদনশীল খাতে যায় তার ওপর। ঢাকা ব্যাংক এই সহায়তাকে উৎপাদনশীল খাতে কেন্দ্রীভূত রাখার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক মানের গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে ব্যাংকটি ব্যাংকিং প্রক্রিয়াকে সরল ও ডিজিটাল করছে। তাদের লক্ষ্য গ্রাহকের শাখা–নির্ভরতা কমানো এবং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোনো তথ্য একবার দিলে বারবার দিতে না হয়।
করপোরেট ঋণের বর্তমান চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি জানান, সুস্থ ও সক্ষম কোম্পানিগুলো সতর্কভাবে ঋণ নিচ্ছে। অন্যদিকে নগদ প্রবাহে চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ সমস্যার সমাধান নয়, বরং ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ঢাকা ব্যাংক পরিমাণের চেয়ে ঋণের গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে পেশাদার ভারসাম্য রক্ষায় তিনি ভূমিকা ও দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজনের ওপর জোর দেন। পর্ষদের কাজ কৌশল নির্ধারণ ও নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, আর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্বচ্ছতার সঙ্গে জবাবদিহি করা।
আগামী তিন বছরের পরিকল্পনায় ঢাকা ব্যাংক প্রবৃদ্ধির আগে মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, খেলাপি ঋণের হার ব্যাংক খাতের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ঋণপোর্টফোলিওকে ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং মূলধন ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, যেখানে সম্পদের গুণগত মানই মুখ্য।




