যুক্তরাষ্ট্রের টেসলাকে পেছনে ফেলে আবারও বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারিচালিত গাড়ি কোম্পানি (ইভি) হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে চীনের বিওয়াইডি। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) চীনা কোম্পানিটি টেসলার চেয়ে বেশি গাড়ি সরবরাহ করে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার টেসলা জানিয়েছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তারা ৪ লাখ ৮০ হাজার ১২৬টি শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) সরবরাহ করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বিওয়াইডি এ প্রান্তিকে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯০টি গাড়ি সরবরাহ করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিওয়াইডির সরবরাহ ৮ দশমিক ২ শতাংশ কমলেও সংখ্যাগত দিক থেকে তারা টেসলাকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টেসলা কেবল শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করলেও শেনজেনভিত্তিক বিওয়াইডি ব্যাটারিচালিত গাড়ির পাশাপাশি প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িও তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বিওয়াইডির বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বিদেশে তাদের গাড়ি সরবরাহ ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯১ ইউনিটে পৌঁছেছে। সংস্থাটির মোট বিক্রির ৪২ দশমিক ৫ শতাংশই এখন বিদেশ থেকে আসে, যা ২০২৫ সালে ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। তবে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে কতটি শতভাগ ব্যাটারিচালিত গাড়ি বিক্রি হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।

সাংহাইয়ের অটোমোবাইল বিশ্লেষক গাও শেন বলেন, ‘বিদেশি বাজারে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিওয়াইডির গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফলে শতভাগ বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে টেসলা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় কোম্পানিটি এগিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, বিওয়াইডিসহ চীনের অন্যান্য গাড়ি কোম্পানি উৎপাদন খরচের দিক থেকে একচেটিয়া সুবিধা পায়, যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের পর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে টেসলা সাময়িকভাবে শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছিল। ওই সময় টেসলার সরবরাহ বার্ষিক ভিত্তিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ২৩ ইউনিটে পৌঁছায়। অন্যদিকে চীনে সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা কমে যাওয়ায় প্রথম প্রান্তিকে বিওয়াইডির শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৮৯টিতে নেমে আসে। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকেই তারা পুনরায় শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে।

বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনার্স সম্প্রতি পূর্বাভাস দিয়েছে, কম উৎপাদন খরচ ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর চীনা গাড়ির বৈশ্বিক রপ্তানি ৪১ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ইউনিট ছাড়িয়ে যেতে পারে। জেপি মরগানের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অটোমোবাইল গবেষণা বিভাগের প্রধান নিক লাইয়ের মতে, ২০২৮ সালের মধ্যে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে চীনা গাড়ি কোম্পানিগুলো বছরে ২৫ লাখ গাড়ি সরবরাহ করতে পারে, যা গত বছরের আনুমানিক ১০ লাখ ইউনিটের তুলনায় ১৫০ শতাংশ বেশি। তাঁর ভাষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপের বাজারের ২০ শতাংশ দখল করবে চীনা ব্র্যান্ড এবং তারা স্থানীয় কোম্পানিগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এদিকে টেসলা জানিয়েছে, তাদের সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি থেকে জুন মাসে ৮৯ হাজার ৯১টি মডেল-৩ ও মডেল-ওয়াই গাড়ি সরবরাহ করা হয়েছে, যা গত বছরের জুনের তুলনায় ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি এবং টানা দ্বিতীয় মাসের মতো চলতি বছরের সর্বোচ্চ মাসিক সরবরাহের রেকর্ড। বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক তেলের বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে অনেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি ঝুঁকছেন, যার ফলে চীনের ইভি শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।