১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই বলকান অঞ্চলের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ছোট পাহাড়ি শহর সেব্রেনিৎসায় সার্ব বাহিনীর হাতে নির্বিচারে প্রাণ হারান হাজার হাজার বসনিয়ান মুসলিম। সংশ্লিষ্ট এলাকাজুড়ে সংঘটিত এই নিধনযজ্ঞে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ নিহত হন। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র সাড়ে সাত হাজার ব্যক্তির দেহাবশেষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েন। বর্তমানে মাত্র ১৯ হাজার ৭৬৭ বর্গমাইল আয়তনের দেশটি তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর অস্বস্তিকর সহাবস্থানের জায়গা। বসনিয়ান মুসলিম, সার্ব অর্থোডক্স ও ক্রোয়াট ক্যাথলিক—এই তিন গোষ্ঠীর আলাদা আলাদা প্রতিনিধি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের সবার সম্মতি আবশ্যক। প্রশাসনিকভাবেও বসনিয়া দ্বিখণ্ডিত: ফেডারেশন অব বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং রিপাবলিক অব সার্পসকা। সার্পসকার নিজস্ব প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী থাকায় দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর সার্বিয়ার তৎকালীন নেতা স্লোবোদান মিলোশেভিচ 'গ্রেটার সার্বিয়া' গঠনের লক্ষ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদে মেতে ওঠেন। তাঁর মতে, যারা অটোমান শাসনামলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল, তারাই বসনিয়ান মুসলিম—এবং এই 'ভ্রান্ত' পথ থেকে তাদের 'মুক্ত' করাই প্রয়োজন। এই বিকৃত চিন্তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল সেব্রেনিৎসা গণহত্যা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিলোশেভিচ দণ্ডিত হলেও তাঁর রোপিত বিষবৃক্ষের ফল আজও ভুগতে হচ্ছে বসনিয়ার মানুষকে। ওই নৃশংসতার শিকারদের স্মরণে ২০০১ সালে সেব্রেনিৎসায় গড়ে তোলা হয় একটি স্মৃতিসৌধ। এখন পর্যন্ত শনাক্ত প্রতিটি মানুষের নাম শ্বেতপাথরে খোদাই করা হয়েছে। প্রতি বছর ১১ জুলাই হাজার হাজার মানুষ এখানে জড়িয়ে প্রার্থনায় মগ্ন হন। স্মৃতিসৌধের বিপরীতে একটি পরিত্যক্ত ব্যাটারি কারখানায় স্থাপিত যুদ্ধকালীন জাদুঘরে সংরক্ষিত দুর্লভ ভিডিও চিত্র ও ছবিগুলো তখনকার বিভীষিকার ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে। তবে সার্বিয়ার কট্টরপন্থীরা আজও এই গণহত্যার ঘটনা স্বীকার করতে রাজি নন। সার্পসকা অঞ্চলে বসবাসরত মুষ্টিমেয় বসনিয়ান মুসলিম প্রতিনিয়ত মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়ন এবং উচ্ছেদের হুমকির মুখে দিন কাটাচ্ছেন। অর্থাভাবে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক ভবন এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি; রাজধানী সারায়েভো থেকে সেব্রেনিৎসায় সরাসরি গণপরিবহনও নেই। স্মৃতিসৌধে খোদিত একটি প্রার্থনায় বলা হয়েছে—এই শোক যেন শক্তিতে পরিণত হয়, প্রতিশোধের স্পৃহা যেন সুবিচারে রূপ নেয় এবং পৃথিবীর আর কোথাও যেন কোনো দিন কোনো সেব্রেনিৎসার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কিন্তু গাজা, লেবাননসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধের আগুন এখনো নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরে চলেছে, যা সেই অসমাপ্ত প্রার্থনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।