চলতি সপ্তাহে বৈশ্বিক বাজারে সোনার মূল্য টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো ঊর্ধ্বমুখী ছিল। শুক্রবার স্পট মার্কেটে এক পর্যায়ে দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৬৩১ ডলার ৯৯ সেন্টে উন্নীত হয়, যা গত ১৫ মের পর থেকে সর্বোচ্চ স্তর। সপ্তাহজুড়েই সোনার দাম পাঁচ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রায় ৯০ ডলার প্রতি আউন্সের সমান। মাসিক পরিসংখ্যান আরও চমকপ্রদ—গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্য অনুযায়ী গত এক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ৪৬৬ ডলার বা ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ। এই ধারাবাহিক উত্থানের ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পর থেকে যে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তাতে ছেদ পড়েছে। অনিশ্চিত সময়ে সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ে; সাম্প্রতিক সময়ে ব্যতিক্রম দেখা গেলেও এখন আবার সেই প্রচলিত ধারা ফিরে এসেছে।
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে মার্কিন ডলারের দুর্বলতা। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর থেকেই ডলারের দরপতন শুরু হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বন্ড বাজারে সরকারের এই হস্তক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের ডলারের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। ডলারের মান কমলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ডলারে নির্ধারিত সোনার মূল্য তুলনামূলকভাবে কম মনে হয়, ফলে চাহিদা ও দাম—উভয়ই বাড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হলো, চলতি সপ্তাহে সোনার দাম ২০০ দিনের গড় দাম—প্রায় ৪ হাজার ৫১৩ ডলার—অতিক্রম করেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্তর অতিক্রম করা মূল্যবান ধাতুটির জন্য ইতিবাচক সংকেত। এর ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের অর্থ সোনার বাজারে প্রবেশ করছে। টিডি সিকিউরিটিজের কমোডিটি কৌশল বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান বার্ট মেলেক মন্তব্য করেন, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাঁর মতে, এই গতি অব্যাহত থাকলে দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি ডলারের পতনকেও সমানভাবে দায়ী করেছেন।
ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সুদহার নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কিছু দুর্বলতার কারণে ভবিষ্যতে সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে এসেছে। যেহেতু সোনা একটি সুদবিহীন সম্পদ, তাই সুদের হার কম বা স্থিতিশীল থাকার প্রত্যাশায় এর বিনিয়োগ আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। গোল্ডম্যান স্যাকসের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সোনার কল অপশনের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কল অপশন হলো এমন একটি আর্থিক চুক্তি, যা বিনিয়োগকারীদের নির্দিষ্ট দামে ভবিষ্যতে সম্পদ কেনার অধিকার দেয়, কিন্তু বাধ্যবাধকতা চাপায় না।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার বিপরীতে সুরক্ষা হিসেবে সোনার ব্যবহার বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট। একই সঙ্গে সোনাভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দাম কেবল ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে, দেশের বাজারেও বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত তিন দিনে দুবার দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে সোনার ভরি আবার ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অতিক্রম করেছে।
চাহিদার দিক থেকে, ভারতে খুচরা পর্যায়ে কিছুটা হ্রাস লক্ষ্য করা গেলেও চীনের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাইয়ে সোনা কেনার পরিমাণ কমিয়ে ৭ দশমিক ৮ টনে নামিয়েছে। শুক্রবার অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও বেড়েছে—রুপার দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্সে ৬৯ ডলার ৬২ সেন্ট, প্ল্যাটিনাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ ও প্যালাডিয়াম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।




