গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের ইস্পাত, ওষুধ ও বস্ত্র খাতের কারখানাগুলো ডিজেল ও ফার্নেস তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিএসআরএমের মতো বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাস না পেয়ে বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন চালু রাখলেও সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম পণ্য তৈরি করতে পারছে। একই সঙ্গে পাবনা ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ওষুধ কারখানাগুলোও ডিজেল ব্যবহার করে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২২২ কোটি ঘনফুটে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যদিও চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর থেকে এই সংকট আরও তীব্র হয়। স্বাভাবিক সময়ে মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে দিনে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হতো। দুর্ঘটনার পর প্রায় ২৫ দিন সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি ও এক্সিলারেটেরটি আংশিক চালু হলেও নতুন এলএনজি কার্গোর অভাবে স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এক্সিলারেটের সরবরাহ ক্রমে কমে গত বুধবার বেলা তিনটার দিকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারি তিন তেল বিপণন কোম্পানি—পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের আগস্টের প্রথম ১৫ দিনের হিসাব বিশ্লেষণে এই চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পদ্মা অয়েলের শিল্প গ্রাহকদের কাছে ডিজেল বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ এবং ফার্নেস তেল ১৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পে ডিজেল বিক্রি ৩ হাজার ৭৮১ টন থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৮৯২ টনে দাঁড়িয়েছে। ফার্নেস তেলের বিক্রি শিল্প খাতে ১৮৯ টন থেকে ১ হাজার ৮০৯ টনে উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ৮৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে মোট ফার্নেস বিক্রির বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গেছে—সেখানে বিক্রি ৭ হাজার ৯১১ টন থেকে ২০ হাজার ৩৫০ টনে পৌঁছেছে।
পদ্মার কয়েকটি বড় শিল্প গ্রাহকের তথ্যেও চাপের চিত্র ফুটে উঠেছে। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের ডিজেল গ্রহণ গত বছরের ২৬৫ দশমিক ৬০ টন থেকে বেড়ে ৪৪৩ দশমিক ৯৩ টন হয়েছে—প্রায় ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি। বেঙ্গল গ্লাসের গ্রহণ ২২ দশমিক ৭৭ টন থেকে ৫৩ দশমিক ১২ টনে উন্নীত হয়েছে, যা দ্বিগুণের বেশি। আল-মুসলিম গ্রুপের একেএম নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ২০০ শতাংশ—৩৭ দশমিক ৯৪ টন থেকে ১১৩ দশমিক ৮৩ টন। একমি ল্যাবরেটরিজ ৬৮ দশমিক ৩০ টন থেকে ২৭৬ দশমিক ৯৮ টনে উন্নীত হয়েছে (প্রায় ৩০৬ শতাংশ)। যমুনা গ্রুপের গ্রহণ ১৫ দশমিক ১৮ টন থেকে ৬৮ দশমিক ৩০ টনে (৩৫০ শতাংশ) এবং এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালের ৭ দশমিক ৫৯ টন থেকে ৬০ দশমিক ৭১ টনে (৭০০ শতাংশ) বৃদ্ধি পেয়েছে। ফার ইস্ট নিটিং ও ক্রাউন ওয়্যারসের মতো প্রতিষ্ঠান গত বছর ডিজেল না নিলেও এবার যথাক্রমে ৮৩ দশমিক ৪৭ ও ৭৫ দশমিক ৮৯ টন নিয়েছে।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শিল্প গ্রাহকদের কাছে ডিজেল বিক্রি ৭ হাজার ১২২ টন থেকে ১১ হাজার ৭২২ টনে (প্রায় ৬৫ শতাংশ) এবং মোট ডিজেল বিক্রি প্রায় ২১ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানিটির শিল্পে ফার্নেস বিক্রি ২৩৬ টন থেকে ৬২৩ টনে বৃদ্ধি পেলেও সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে—সেখানে বিক্রি ৭ হাজার ৬৩৭ টন থেকে ১৯ হাজার ২৩৬ টনে উন্নীত হয়েছে। ফলে মেঘনার মোট ফার্নেস বিক্রি ১৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে যমুনা অয়েলের শিল্প গ্রাহকদের কাছে ডিজেল বিক্রি ৪ হাজার ৯২৮ টন থেকে ৬ হাজার ৫৬৪ টনে এবং শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে ফার্নেস বিক্রি ৩ হাজার ৯৮৯ টন থেকে ১২ হাজার ৯২৮ টনে উন্নীত হয়েছে—বৃদ্ধির হার ২২৪ শতাংশ।
তিন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত তেল কেনা পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানার মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই এবার বাড়তি ডিজেল ও ফার্নেস নিচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জাতীয় পর্যায়ের তথ্যে একই প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টের প্রথমার্ধে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৮ টন—দৈনিক গড় প্রায় ১১ হাজার ৯৬৯ টন, যা গত বছরের পুরো আগস্টের দৈনিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ফার্নেস বিক্রি ৬৬ হাজার ৬৮৮ টনে পৌঁছেছে—দৈনিক গড় প্রায় ৪ হাজার ৪৪৬ টন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৬ শতাংশ বেশি। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম জানিয়েছেন, বাড়তি চাহিদা সত্ত্বেও মজুতের সংকট নেই; আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক এবং তেলবাহী জাহাজ নিয়মিত আসছে। ১৫ আগস্টের হিসাবে দেশের সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮২ টন এবং ফার্নেসের ৫১ হাজার ৩৪৮ টন। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামীকাল রোববার নতুন এলএনজি কার্গো এলে সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানা থেকে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলে চাপ বেশি। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসানও জানিয়েছেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি চাহিদা এলেও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং ঢাকা অঞ্চলে এই চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
বাড়তি তেল ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের খরচ ব্যাপক হারে বাড়ছে। বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর ডিজেল ও ফার্নেস তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাঁদের তেলের ব্যবহার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং উৎপাদন খরচ অন্তত চার গুণ হয়েছে। ওষুধ শিল্পেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৫ টাকা খরচ হয়, কিন্তু ডিজেল জেনারেটরে একই বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৪১ থেকে ৪২ টাকা। তাঁর হিসাবে সামগ্রিক জ্বালানি খরচ ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে জেনারেটরের রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন কমে যাওয়ার ক্ষতি। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালানোর কারণে সার্ভিসিং ঘন ঘন করতে হচ্ছে। ওষুধের মতো সংবেদনশীল উৎপাদনে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো ব্যাচ বাতিল করতে হয়।




