মেয়াদ শেষ হতে এখনো প্রায় ১০ মাস বাকি থাকলেও রাজধানীর মাতুয়াইলের হাজী আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া কলেজের গভর্নিং বডির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক জাকির আহমেদ চৌধুরীকে সরানোর একটি তৎপরতা জোরদার হয়েছে। এই উদ্যোগে শামিল হয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা ও কলেজের অধ্যক্ষ আবু নোমান মো. মতিয়ার রহমান। সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দিয়ে শারমিন আক্তার রিতাকে সভাপতি মনোনীত করার অনুরোধ জানান। তবে তিনি দাবি করেছেন, ‘ভুল তথ্য’ পেয়েই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমানও স্বীকার করেছেন, বিএনপি নেতাদের চাওয়ায় তিনি সভাপতি পরিবর্তনের আবেদন করেছেন।

শিরীন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল যে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই তিনি নতুন কমিটি গঠনের জন্য চিঠি পাঠান। পরে তিনি শারমিন আক্তারের ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় জানতে পেরে প্রক্রিয়া থামিয়ে দেন। অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমান জানান, বিএনপির সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা ও অন্য বিএনপি নেতাদের চাওয়াতেই তিনি আবেদন পাঠিয়েছিলেন। নিজের পদের মেয়াদ বাড়লে খুশি হবেন, তবে না বাড়লেও আপত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শারমিন আক্তার নিজেকে ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যাত্রাবাড়ী থানা কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি থাকা একটি ঈদের শুভেচ্ছা পোস্টারে তাঁর ছবি দেখা গেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় করা একটি হত্যা মামলায় ৮৫ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে। শারমিন আক্তার এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে পারে। দলের স্থানীয় নেতারা তাঁকে এই পদে চাইছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

কলেজের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক জাকির আহমেদ চৌধুরীকে গত বছরের ২৯ মে দুই বছরের জন্য দায়িত্ব দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৮ মে। অধ্যক্ষের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন নাকচ হওয়ার পরপরই সভাপতি পরিবর্তনের তৎপরতা শুরু হয়। অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমানের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১০ অক্টোবর। মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়াতে তিনি গত ২৭ জুন আবেদন করেছিলেন, কিন্তু কলেজের আর্থিক সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় কমিটি তা নাকচ করে দেয়। বর্তমানে কলেজের আর্থিক অবস্থা নাজুক, কয়েকজন শিক্ষকের বেতন বকেয়া রয়েছে বলে জানান জাকির আহমেদ।

পরিচালনা কমিটির দাতা সদস্য আবু তাহের মিয়াজি বলেন, অধ্যক্ষ চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন, কিন্তু কলেজের বাস্তবতা বিবেচনায় কমিটি তা অনুমোদন করেনি। এ কারণে অধ্যক্ষ মনঃক্ষুণ্ন হয়ে থাকতে পারেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সভাপতি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁকে সরিয়ে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সভাপতি করা কলেজের জন্য ভালো হবে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ নিজের চাকরির মেয়াদ বাড়াতে চান, অন্যদিকে মহিলা দলের নেত্রী কলেজ পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করতে চান। এই স্বার্থেই দুই পক্ষ এক হয়ে পরিচালনা কমিটি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমান অবশ্য যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিজের পদের মেয়াদ বাড়লে তিনি খুশি হবেন, তবে না বাড়লেও আপত্তি নেই। সভাপতি জাকির আহমেদ বলেন, অধ্যক্ষের মেয়াদ না বাড়ানোর কারণে পুরো গভর্নিং বডি পরিবর্তনের উদ্যোগ দুঃখজনক। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি মনে করে কলেজের স্বার্থে নতুন কমিটি প্রয়োজন, তাহলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন জানান, কলেজ অধ্যক্ষের আবেদন তাঁরা পেয়েছেন। তবে পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যথাযথ কারণ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নতুন কমিটি অনুমোদন করে না।