টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে যাওয়ার পর চার কন্যাসন্তান নিয়ে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের রোেকয়া বেগম ও দিল মোহাম্মদ দম্পতি। ছিন্ন পলিথিনের আবরণে মাথা গোঁজা হলেও প্রতিকূলতা তাদের তিন কন্যার অদম্য শিক্ষানুরাগে বাধা হতে পারেনি।

দম্পতির সংগ্রামী জীবনের চিত্র অত্যন্ত করুণ। চল্লিশ বছর বয়সী রোকেয়া বেগম জন্ম থেকেই এক চোখের দৃষ্টিহারা। সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, তার স্বামী সত্তরোর্ধ্ব দিল মোহাম্মদ, পাঁচ বছর আগে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারান। এমতাবস্থায় অন্যের কৃষিজমিতে কাজ করে দৈনিক পাঁচশত টাকা উপার্জনের মাধ্যমে তিনিই সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহ করতেন।
তবে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের করুণ অবস্থাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ৪ জুলাই থেকে টানা দশ দিনের ভারী বর্ষণে বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় রামু উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়। ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় ছিল রোকেয়া বেগমের পাহাড়সংলগ্ন সরকারি খাসজমির উপর গড়ে ওঠা মাটির বাড়িটিও, যার তিন দিকের দেয়াল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

সরেজমিনে চিত্রটি আরও করুণ। ঘরের ভেতর ভেজা কাপড়, পাঠ্যপুস্তক ও কিছু আসবাব গাদাগাদি করে রাখা। রান্নাবান্নার জন্য শুকনো স্থানের অভাব। তবুও বৃষ্টি থেকে রেহাই পেলেই উঠোনে পলিনের আসন পেতে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে বাসে। তাদের জ্যেষ্ঠ কন্যা উম্মে হাবিবা স্থানীয় একটি মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। অপর দুই বোন উম্মে সালমা (৯) ও জান্নাতুল মাওয়া (৬) যথাক্রমে পঞ্চম শ্রেণি ও নার্সারিতে অধ্যয়নরত। সর্বকনিষ্ঠ আঁখি আক্তারের বয়স মাত্র চার।

কন্যা স্নেহে আপুত রোেকয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা নিয়ে তার আক্ষেপ নেই, কিন্তু একজন মা হিসেবে কন্যাদের এই দুর্দশা সহ্য করতে পারেন না। তিনি আরও বিলাপ করে বলেন, সন্তানেরা নিজ উদ্যোগেই পড়ালেখায় মনোযোগী, অথচ তাদের প্রয়োজনীয় বই কিনে দিতেও তার পক্ষে সম্ভব হয় না, যা তাকে গভীর অপরাধবোধে ভুগিয়ে তোলে। স্বামী দিল মোহাম্মদের অসহায় বক্তব্য, "পঙ্গু হয়ে ঘরের কোণায় পড়ে থাকি। মেয়েরা পড়তে চায়; কিন্তু বাবা হিসেবে কিছুই করতে পারছি না।"

তবে সহায়তা সম্পূর্ণরূপে থেমে নেই। বন্যার পর গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের পরিবারকে কিছু পরিমাণ চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ ও নগদ পাঁচ হাজার টাকা সরাহ করা হয়। অন্যান্য ব্যক্তির কাছ থেকেও কিছু আর্থিক সহযোগিতা মিলেছে। কিন্তু এই স্বল্প পরিমিত সহায়তা দিয়ে স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, 'রোকেয়া বেগমের পরিবারটি খোঁজ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা, নিরাপদ বাসস্থান ও মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আশা করি দ্রুত সমাধান হবে।'