কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণের সকল তৎপরতার ওপর অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেয়। একইসাথে, কেন এই নির্মাণকাজকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রুলও জারি করা হয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) গত মাসে একটি রিট আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শুনানি গ্রহণ করে আদালত এই আদেশ দেন। বেলা তাদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় ৪ দশমিক ৮৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ সড়ক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগের আপত্তি সত্বেও ওই সংরক্ষিত বনের অসংখ্য গাছ ও পাহাড় কেটে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছিল বলে বেলা অভিযোগ করে।

রিটকারীর পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী, তাকে সহায়তা করেন আইনজীবী রুমানা শারমিন শান্তা। অপরপক্ষে, রাষ্ট্রের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

জারি করা রুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আইনজীবী রুমানা শারমিন শান্তা জানান, আদালত পরিবেশ সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ভূমি সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রধান বনসংরক্ষক এবং চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের জবাব দিতে বলেছেন। রুলে মূলত দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে— প্রথমত, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সড়ক নির্মাণের এই উদ্যোগ এবং তা বন্ধে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনবহির্ভূত হবে না? দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়কের উদ্যোগ বাতিল এবং ইতোমধ্যে নির্মিত পাকা অংশ অপসারণ করে কেন পুরো জীববৈচিত্র্য রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হবে না?

প্রসঙ্গত, বেলা আদালতকে জানায় যে, ১৯৫৪ সালে মহেশখালীর ১২ নম্বর পাহাড় মৌজার ১৮,২৮৬.৪০ একর ভূমি তৎকালীন কৃষি ও ত্রাণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১০০ বছরের জন্য বন দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে ওই ভূমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট জারি করা হয়। বন আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী, এই বনে অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া যেকোনো কার্যক্রমই নিষিদ্ধ। ২০২৬ সালের বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন এবং বণ্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনেও প্রাকৃতিক বনের বনবিরুদ্ধ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদে বন ও বণ্যপ্রাণী রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথাও স্পষ্ট বলা আছে।

তবে এই সকল আইনি বিধান ও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার লংঘন করেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সংযোগ সড়কটির নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল, যার ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার অংশই সংরক্ষিত বনের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বেলা এই কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ অবৈধ আখ্যা দিয়ে জনস্বার্থে রিট করে।

উল্লেখ্য, বন বিভাগের রেকর্ডে ভূমিটা তাদের নামেই নথিভুক্ত আছে এবং এই অঞ্চলটি ব্যাপক জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। হাইকোর্টের এবারের দুই মাসের নিষেধাজ্ঞার ফলে আগামী দুটি মাস সড়কটির আর কোনো নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।