প্রচণ্ড খরার কারণে বুদাপেস্টের দানিউব নদীতে পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নেমে যাওয়ায় নদীর তলদেশ থেকে উদ্ধার হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দুই জার্মান সৈন্যের দেহাবশেষ। তাদের কঙ্কালের পাশাপাশি মিলেছে দুটি পরিচয়পত্র ট্যাগ, একটি প্রায় অক্ষত জার্মান ওয়েহরমাখট মোটরসাইকেল, একটি বিয়ের আংটি এবং 'কুবান শিল্ড' নামে পরিচিত একটি যুদ্ধব্যাজ। জার্মান যুদ্ধকালীন সমাধি কমিশন (German War Graves Commission) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৮০ বছরেরও বেশি সময় পর এই অসাধারণ আবিষ্কার অনেক পরিবারের জন্য তাদের পূর্বপুরুষদের কী হয়েছিল তা জানার নতুন আশা জাগিয়েছে। কমিশনের মুখপাত্র আর্নে শ্রেডার জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ডকে বলেন, "এখন শুরু হয়েছে এক ধাঁধাঁর খেলা, যেখানে আমরা ওই দুই মৃত সৈন্যের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করব।"
গত ২ আগস্ট বুদাপেস্টের কেন্দ্রীয় এলাকায় নদীর তীরে পাথরের মধ্যে মোটরসাইকেলের একটি অংশ আটকে থাকতে দেখে পথচারীরা কর্তৃপক্ষকে খবর দিলে এই উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। উদ্ধারকারী দলটি ঘটনাস্থলে ট্যাংক-বিধ্বংসী মাইনও খুঁজে পায়, যার ফলে নদীর তীরবর্তী এলাকাটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট মোতায়েন করা হয়।
কমিশনের মতে, নদীর তলদেশের পলি ও তেলের মিশ্রণের কারণে মোটরসাইকেলসহ পাওয়া কিছু জিনিস বিশেষ করে পরিচয়পত্র ট্যাগগুলো অসাধারণভাবে ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। জার্মান সরকারের পক্ষে যুদ্ধকালীন নিহতদের সন্ধান, উদ্ধার ও সমাধির কাজ করে থাকা এই অলাভজনক সংস্থাটি জানিয়েছে, মোটরসাইকেলটি সম্ভবত ডিকেডব্লিউ এনজেড ৩৫০-১ মডেলের, যা ১৯৪৪ সালে বিশেষভাবে যুদ্ধকালীন ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
উদ্ধার হওয়া দুটি ট্যাগের মধ্যে একটি ওয়েহরমাখট সৈনিকের এবং অন্যটি ওয়াফেন-এসএস সদস্যের বলে কমিশন নিশ্চিত করেছে। নুরেমবার্গ বিচারে ওয়াফেন-এসএসকে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী একটি অপরাধী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সৈনিকদের পরিচয়পত্র ট্যাগ মৃত্যুর পর দুভাগে ভাগ করা হতো — একটি অর্ধেক সৈনিকের কাছে রাখা হতো এবং অন্যটি জার্মান সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হতো, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের হিসাব রাখত এবং তাদের পরিবারকে খবর দিত।
জার্মান যুদ্ধকালীন সমাধি কমিশন বলেছে, এই দুই সৈন্যের পরিবার নিহতের আনুষ্ঠানিক নোটিশের জন্য "নিরর্থক অপেক্ষা" করেছিল। সংস্থাটি তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে এবং যাদের আত্মীয় এখনও নিখোঁজ রয়েছে, তারা তাদের নাম ডেটাবেসে খুঁজতে পারবেন। তবে তাদের আসল পরিচয় নির্ধারণে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কমিশন, কারণ পরিচয়পত্র ট্যাগ ও কুবান শিল্ড আসলেই ওই দুই সৈন্যের কিনা তা যাচাই করতে হবে। সংস্থাটি বলেছে, "মূল মালিকদের নাম সম্ভবত দ্রুত পাওয়া যাবে, কিন্তু সেটি কেবল প্রথম ধাপ। ধাঁধাঁর অনেকগুলো টুকরো সংগ্রহ করতে হবে, আর ফলাফল অনিশ্চিত।" সৈনিকদের পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে হাড়ের বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপগুলোতে এই আবিষ্কারের খবর ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। একটি ফেসবুক গ্রুপের এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "পানির স্তর কমে যাওয়া যতটাই খারাপ, তবুও আমি খুশি যে শোকাহত পরিবারগুলো তাদের আত্মীয়দের অবস্থান সম্পর্কে আবারও জানতে পারছে, এবং নিহত সৈনিকদের মর্যাদাপূর্ণ সমাধি দেওয়া যাবে। তারা শান্তিতে বিশ্রাম নিক।" ওই গ্রুপটিতে মানুষ তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া পূর্বপুরুষদের ভাগ্য সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করে।
হাঙ্গেরির রাজধানীর উপকণ্ঠে বুদাওরসের জার্মান যুদ্ধকালীন কবরস্থানে এই দুই সৈনিককে সমাহিত করা হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে বুদাপেস্ট সোভিয়েত রেড আর্মি এবং জার্মান ওয়েহরমাখটের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের সাক্ষী ছিল। সম্প্রতি দানিউব নদীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও দেখা গেছে, যার মধ্যে সার্বিয়ার প্রাহোভোর কাছে একটি ভাঙা জাহাজের হালও রয়েছে। অন্যদিকে, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং সার্বিয়াও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও কম বৃষ্টিপাতের প্রভাব মোকাবিলা করছে।




