চাঁদের পৃষ্ঠে যে আলো আমরা দেখি, তার উৎস নিয়ে প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেন মধ্যযুগের মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে হাইসাম। তিনি দেখান, সূর্য কিংবা দূরবর্তী নক্ষত্রের মতো চাঁদের নিজস্ব কোনো উজ্জ্বলতা নেই; আমরা যা দেখি, সেটি কেবল সূর্যের প্রতিফলিত রশ্মি। চাঁদের গায়ে দেখা যাওয়া অস্পষ্ট দাগ ও ছোপ সম্পর্কে তৎকালীন প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো খণ্ডন করতে গিয়ে তিনি রচনা করেন কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ ‘মাহিয়্যাতুল আসার আল্লাজি ইয়াজহারু আলা ওয়াজহিল কামার’। এ গবেষণায় গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি ব্যাখ্যা করেন, চাঁদের অভ্যন্তরের ঘনত্বের তারতম্যই প্রতিফলিত আলোর কিছু অংশকে তুলনামূলক অন্ধকার করে তোলে। একই ধারাবাহিকতায় আল-বাত্তানি—ত্রিকোণমিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিস্ময়কর দক্ষতার অধিকারী—তাঁর ‘ফি আদওয়ায়িল কাওয়াকিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, মহাবিশ্বের অন্যান্য নক্ষত্ররাজি নিজস্ব শক্তিতে জ্বলে উঠলেও চাঁদ সম্পূর্ণভাবে সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল। তিনিও গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, চাঁদের উপাদান নিজে আলো উৎপন্ন করতে অক্ষম।

ইবনে আল-হাইসামের বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ ও লেন্স বিষয়ে করা মৌলিক গবেষণা পরবর্তীকালে গ্যালিলিওকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র (টেলিস্কোপ) উদ্ভাবনে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। (আলী আবদুল্লাহ আল-দিফা, আলামুল ফিজিয়া ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১৬৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

চন্দ্রগতির অসঙ্গতি নিয়ে গবেষণায় বাগদাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবু আল-ওয়াফা একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেন। মহাকাশে চাঁদের আবর্তনের গতি সর্বদা একই নিয়মে চলে না; এর মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু তারতম্য দেখা যায়। উনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় যে, আবু আল-ওয়াফা এই অসঙ্গতিটি প্রথম চিহ্নিত করে গাণিতিক সমীকরণে রূপ দিয়েছিলেন। (এল. এ. সেদিও, তারিখুল আরব আল-আম, পৃষ্ঠা: ৩৪৬, দারু ইহইয়ায়িল কুতুবিল আরাবিয়্যা, কায়রো, ১৯৪৮)

মিসরের ফাতেমীয় আমলের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে ইউনুস মোকাত্তম পাহাড়ের শীর্ষে নির্মিত পর্যবেক্ষণাগার থেকে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালান। তিনি চন্দ্রগতির ত্বরান্বিত হার এবং ক্রান্তিবৃত্তের হেলানো কোণের হিসাব এত নিখুঁতভাবে করেন যে, তা আধুনিক যন্ত্রের পরিমাপের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। (কাদরি তুকান, তুরাসুল আরবিল ইলমি ফির রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল ফালাক, পৃষ্ঠা: ২৪৩, জামিআত আদ–দুওয়াল আরাবিয়া, কায়রো, ১৯৫৪)

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি মৌলিক ভিত্তি হলো গ্রহ ও উপগ্রহের উপবৃত্তাকার (ইলিপটিক্যাল) কক্ষপথ। সমরকন্দ পর্যবেক্ষণাগারের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিয়াসুদ্দিন জামশিদ গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, চাঁদ ও বুধ গ্রহের কক্ষপথ বৃত্তাকার নয়, বরং উপবৃত্তাকার। (আলী আবদুল্লাহ আল-দিফা, নাওয়াবিগু উলামায়িল আরাব ওয়াল মুসলিমিন ফির রিয়াদিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ২০৬, দারুল ইতসাম, কায়রো, ১৯৮০)

আন্দালুসিয়ার বিজ্ঞানী ইবনে আল-জারকালি—যিনি ইউরোপে ‘আরজাখেল’ নামে পরিচিত—অ্যাস্ট্রোল্যাব যন্ত্রে বিশেষ পাত বা ‘সফিহা’ সংযোজন করে চাঁদের গতিপথ অধ্যয়নের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। কপারনিকাসের যুগ পর্যন্ত ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিজস্ব পর্যবেক্ষণের সক্ষমতার অভাবে আল-জারকালি ও আল-বাত্তানির প্রস্তুতকৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণির ওপর নির্ভর করতেন। (জিগ্রিড হুনকে, শামসুল আরব তুশরিকু আলাল গারব, পৃষ্ঠা: ১৪৪, দারু সাদির, বৈরুত, ২০০০)

ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানের রূপকার নিকোলাস কপারনিকাস তাঁর ‘ডি রেভোলুশনিবাস’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন যে, তাঁর সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের গাণিতিক মডেল তৈরিতে তিনি মুসলিম বিজ্ঞানী আল-বাত্তানি, নাসিরুদ্দিন আল-তুসি এবং সিরিয়ার ইবনে আশ-শাতিরের গবেষণার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। (জাফর আল-আরশাদি, আত-তাফাউকুল ইলমি ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১০১, মুয়াসসাসাতুল বালাগ, বৈরুত, ১৯৯০) এছাড়া জানা যায়, ইউরোপীয় বিজ্ঞানী উইতেলোর আলো-সম্পর্কিত বিখ্যাত গ্রন্থটি মূলত ইবনে হাইসামের ‘কিতাবুল মানাজির’ গ্রন্থ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত; যা পরবর্তীকালে কেপলারকে গ্রহের গতির সূত্র আবিষ্কারে সহায়তা করেছিল।

এই ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন’ (আইএইউ) চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির মুখ ও গিরিখাতের নামকরণ করেছে মধ্যযুগের ১৮ জন আরব ও মুসলিম বিজ্ঞানীর নামে। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল-বিরুনি, আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে ইউনুস, ইবনে হাইসাম, ইবনে ফিরনাস, আল-ফরগানি, আল–বাত্তানি, নাসির উদ্দিন, আবু আল–ওয়াফা ও ওমর খৈয়াম।

জানা যায়, মধ্যযুগের মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের রচিত পাণ্ডুলিপির মাত্র পাঁচ শতাংশ এ পর্যন্ত অনূদিত হয়েছে; তবুও এই স্বল্পাংশই আধুনিক বিজ্ঞানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। মুসলিম সমাজকে বিজ্ঞানমুখী করার উপায় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।