আগামী ২৫ অক্টোবর পিটসবার্গ স্টিলার্স ও নিউ অরলিন্স সেইন্টস ফ্রান্সের স্তাদ দে ফ্রান্সের মাঠে নামার মাধ্যমে আমেরিকান ফুটবলের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। এটি ইউরোপীয় মাটিতে লিগটির শক্ত অবস্থান গড়ার কৌশলের অংশ, যে মৌসুমে লন্ডন, মাদ্রিদ, মেলবোর্ন ও রিও ডি জেনিরোসহ চার মহাদেশের সাত দেশে রেকর্ড সংখ্যক নয়টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করা হবে।
লিগটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা টিম এলিস ফরচুন ম্যাগাজিনকে বলেছেন, একটি খেলা আয়োজনকে তারা অনুঘটক হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। এর মাধ্যমে দর্শকদের আগ্রহ তৈরি, সংলাপের সূত্রপাত ও গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। স্টেডিয়ামের ৮০ হাজার টিকেটের চেয়ে খেলা শেষের পরবর্তী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে কোটি কোটি সমর্থক তৈরির বিষয়টিকে তিনি বড় করে দেখছেন। বিদেশে লিগটির প্রকৃত চাহিদা তৈরির ইঙ্গিতও মিলছে। লন্ডন ইতিমধ্যেই সবচেয়ে পরিপক্ব বিদেশি বাজারে পরিণত হয়েছে, আর প্যারিস ও মেলবোর্নে সমর্থকগুষ্টির সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এলিস। মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠের এক লাখ ধারণক্ষমতার বিপরীতে সেখানে আয়োজিত এনএফএল ম্যাচের জন্য আগ্রহ নিবন্ধন করেছেন দেড় লাখেরও বেশি মানুষ।
তবে টিকেট ও আতিথেয়তা থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে মিডিয়া সম্প্রচার, পৃষ্ঠপোষকতা ও পণ্য বিক্রির চুক্তি, যখন একক ম্যাচের দর্শক বার্ষিক পঞ্চাশটিরও বেশি খেলা দেখায় আসক্ত সমর্থকে রূপান্তরিত হবেন। এলিস উল্লেখ করেন, ফিফা দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে বিশ্বব্যাপী ফুটবল জনপ্রিয় করে তুলেছে, তা থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সীমান্ত অতিক্রম করা তারকাদের শক্তি ও অ্যাথলেটদের গল্প বলার গুরুত্বকে তিনি অনুকরণীয় বলে মনে করেন।
অতীতে ইউরোপ জয়ের নেশায় এনএফলের ব্যর্থতার ইতিহাসও কম নয়। ১৯৭৪ সালে এক আন্তমহাদেশীয় ফুটবল লিগের পরিকল্পনা বাস্তবে খেলা শুরু ছাড়াই ভেস্তে যায়। ১৯৮৯ সালে গঠিত এনএফএল ওয়ার্ল্ড লিগ কিছুটা সাফল্য পেলেও দুই মৌসুম পর স্থগিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে এটি ইউরোপীয় সার্কিটে পুনর্গঠিত হয়ে এনএফএল ইউরোপা নামে ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ড ও স্পেনে চলতে থাকে। কিন্তু নিজস্ব বাজারে কখনো টেলিভিশন চুক্তি করতে না পারায় ও রাজস্বের অভাবে ২০০৭ সালে পুরো প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ষোল বছরে এই উদ্যোগে প্রায় ৪০ কোটি ডলার লোকসান হয়েছিল।
আগের সম্প্রসারণ প্রচেষ্টাগুলোর ব্যর্থতার কারণ হিসেবে এলিস মনে করেন, তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল খেলাটি নিজেই নিজেকে বিক্রি করবে। তিনি বলেন, বহিরাগতরা কিভাবে এই খেলাকে দেখেন তা বোঝার চেষ্টা খুবই কম ছিল। অনভিজ্ঞ ইউরোপীয় দর্শকের কাছে আমেরিকান ফুটবল বিশৃঙ্খল এবং গ্ল্যাডিয়েটরের মতো বর্ম পরিহিত শক্তিমান মানুষদের সংঘর্ষের দৃশ্য মনে হয়, যাকে তারা খেলার চেয়ে দৃশ্যকাব্যই বেশি মনে করেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে ৪১ শতাংশ নাগরিকের কাছে এটিই প্রিয় খেলা।
এলিস দায়িত্ব নেয়ার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিক বাজারগুলোতে ক্রীড়া সম্পর্কে সচেতনতা ও ধারণা অনুসন্ধানের জন্য গবেষণা চালান। দেখা যায়, আন্তর্জাতিক দর্শকরা এই বিশালকায় অ্যাথলেটদের বিশ্বমানের স্প্রিন্টার বা অলিম্পিক পদক বিজয়ী হিসেবে নিবন্ধনই করেননি। একই সাথে আরেক গবেষণায় জানা যায়, খেলার জটিলতা ও সহিংসতা প্রাথমিকভাবে একজন নতুন দর্শককে দ্বিধান্বিত করলেও গভীর জ্ঞান তৈরি হলে সেটাই তাদের আসক্তির কারণ হয়। এই তথ্য কাজে লাগিয়ে নৈমিত্তিক দর্শককে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সমর্থকে রূপান্তরের কৌশল তৈরি হয়েছে।
নতুন বাজার দখলের লড়াইে লিগ এখন ইউরোপীয় রুচি ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল। মার্কিন অহংকার বা সোয়াগার ইউরোপে অহংকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়, যা ক্রীড়া বিপণনের ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িত থাকায় পতাকা প্রদর্শনী ও সামরিক ফ্লাইওভারের মতো দেশাত্মবোধক আমেজ বিদেশে সাবধানে প্রয়োগ করতে হয়, নয়তো তা আন্তর্জাতিক দর্শকরা রাজনৈতিক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
লিগটি শুধু দর্শক তৈরির চেষ্টাই করছে না, স্থানীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি ও অংশগ্রহণ বাড়াতেও কাজ করছে। ইংল্যান্ডের লখবোরা ভিত্তিক একটি একাডেমি শিক্ষার্থী অ্যাথলেটদের আমেরিকায় পেশাদার হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফ্ল্যাগ ফুটবল নামক অনাকর্ষণ সংস্করণটি মেয়েদের জন্য প্রবেশপথ হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে এবং ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে এর অভিষেক হতে যাচ্ছে।
আর্থিক দিক বিবেচনায় ইউরোপ বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। গত অর্থবছরে এনএফলের রাজস্ব ২৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, এবং ২০২৭ সালের মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য রয়েছে। মিডিয়া স্বত্বই এর প্রধান আয়ের পথ, বর্তমান সম্প্রচার চুক্তির মূল্য ১১ বছরে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপয়ে এ মডেলটির প্রতিলিপি তৈরি করা অর্থাৎ একটি বড় আর্থিক সাফল্য। এলিসের মতে, আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা হলো, নতুন বাজার জয় করা যায় স্থানীয় রুচির সাথে খাপ খাওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং অপরিবর্তিত প্রকৃত খেলাটি রপ্তানি করে তার চারপাশে গল্প, তারকা ও বিশ্বাস নির্মাণের মাধ্যমে।

