নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে বসবাস করছিলেন বাকপ্রতিবন্ধী এক নারী। গত ৪ জুলাই গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁকে বেধড়ক মারধর ও জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় ৭ জুলাই রাতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় তাঁর। স্থানীয়রা তাঁকে 'ববি বেগম' নামে চিনলেও সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন যে তাঁর আসল নাম ওয়াহিদা বেগম।
শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে ওয়াহিদার দুই স্বজন কবর জিয়ারত করতে এলে তাঁর পরিচয় ও পরিবারের খোঁজ মেলে। নিহতের পৈত্রিক নিবাস বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান। পরিবারের আট ভাইবোনের মধ্যে সাতজনই জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী। ওয়াহিদার বাবা-মাও বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন।
ওয়াহিদার জীবনে নেমে এসেছিল একের পর এক ট্র্যাজেডি। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্বামী মারা যান, একমাত্র কন্যাসন্তানও জন্মের পর পর পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। স্বামী-সন্তানহীন তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। প্রায় ২২-২৩ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান, কিন্তু সেই থেকে আর কোনো হদিস মেলেনি। তিন বছর খোঁজাখুঁজির পর পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন তিনি মারা গেছেন।
মেথিকান্দা স্টেশনে এসে স্থানীয়দের সহায়তায় ওয়াহিদা দিনাতিপাত করতেন। বিনা পারিশ্রমিকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারের কাজ করতেন তিনি। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫-১০ টাকা সহযোগিতা করতেন—সেই অর্থ জমিয়ে রেখেছিলেন তিনি। সেই জমানো টাকার লোভেই তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ।
প্রথমে নিহতের কোনো স্বজন না থাকায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধে প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় স্টেশন–সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয়। এ ঘটনায় মেথিকান্দা স্টেশন মাস্টার বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
ওয়াহিদার ভাগ্নে জামাই সৈকত ইসলাম ফেসবুকে বৃদ্ধ নারী নিহতের সংবাদ দেখার পর স্ত্রীকে দেখান। স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে চিনতে পারেন যে এটি তাঁর খালা ওয়াহিদার মতো। বাড়ির সবাইকে ছবি পাঠালে তারাও নিশ্চিত হন। সৈকত ও আরেক স্বজন গোলাম রব্বানী শনিবার এসে কবর জিয়ারত করেন। গোলাম রব্বানী বলেন, 'আমার মায়ের সঙ্গেই ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওয়াহিদা খালা। ভিডিও কল করে বাড়ির সবাইকে কবর দেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত খালার সন্ধান পেলাম মৃত্যুর পর।'
ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. সাঈদ আহমেদ জানান, নিহত নারীর পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। আগামীকাল পরিবারের অন্য সদস্যরাও আসবেন বলে জানিয়েছেন। বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার ওসি মো. রাকিব হোসেন বলেন, 'ববি বেগম নামে যাকে বলা হচ্ছিল তিনিই ওয়াহিদা বেগম। প্রায় দুই যুগ আগে স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর পর ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলেন, আর ফেরেননি। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।'




