গত শনিবার কক্সবাজারের দরিয়ানগর সমুদ্র সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে প্রয়াত হয়েছেন অক্ষর শৌভিক রায় নামের ৩০ বছর বয়সী এক পর্যটক। তাঁর মরদেহ সোমবার বেলা ১১টার দিকে খুলনা নগরীর হাদিস পার্কের নিকটে থাকা মান্নান চটপটির গলির শেষ প্রান্তে ছয়তলা একটি ভবনের সামনে পৌঁছায়। লাশবাহী ফ্রিজার যানটি থামার পরেই নিস্তব্ধ অপেক্ষমাণ স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।
গাড়ির পেছনের দরজা খোলা মাত্রই উচ্চকিত আহাজারিতে ভেঙে পড়েন মা শুকুরা রায়। ছেলের নিথর দেহ লক্ষ্য করে তিনি বারবার বলে ওঠেন, ‘আমার অক্ষররে একটু আমার কোলে দাও... আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও...’। মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার প্রচেষ্টা করেও ব্যর্থ হন পাশের মানুষজন। একইসঙ্গে ছোট বোন শীর্ষা রায়ও কান্নায় ভেঙে পড়েন; ভাইয়ের এমন পরিণতি মেনে নেওয়া তার পক্ষে কঠিন ছিল।
পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, অক্ষর ছিলেন তিন ভাইবোনের মাঝে সবার বড়। বাবা শেখর রায় করোনাকালে মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্বভার তাঁর কাঁধে উঠে আসে। জটিল আর্থিক পরিস্থিতিতে নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁরা ওই এলাকারই একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে বসবাস করতে থাকেন।
স্বজন অপু সিংহের ভাষ্যমতে, অক্ষর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। পড়াশোনার শুরু খুলনা জিলা স্কুলে, পরে নটর ডেম কলেজ। ভারতের গুজরাট থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করে কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে আসেন এবং সংসারের হাল ধরেন। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকার বনানীর স্টাডি সলিউশন লিমিটেড কোম্পানিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই মানুষটি চিরবিদায় নেওয়ায় আত্মীয়স্বজনেরা চরম দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
ঘটনার দিন বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়েছিলেন অক্ষর। দরিয়ানগর সৈকতে ২ হাজার টাকা দিয়ে প্যারাসেইলিংয়ের টিকিট কেনার পর বেলা দেড়টার দিকে তাকে আকাশে ওড়ানো হয়। ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট ওপরে ওঠার পরই দড়ি ছিড়ে বঙ্গোপসাগরের জলে আছড়ে পড়েন তিনি। তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরিবারটি জানান, বিপজ্জনক আবহাওয়া সত্ত্বেও সেখানে প্যারাসেইলিং চালু রাখা হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ।
বেদনার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্যে, ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়েছে কোনো উদ্ধারকারী কর্মী সেখানে ছিলেন না। নিরাপদ পর্যটনের অভাবকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে পরিবার। তাঁরা দোষীদের বিচার ও সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্যারাসেইলিং সংস্থার বিরুদ্ধে খুলনা মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের আরও অভিযোগ, মরদেহ ফেরত নিয়ে আসতেও পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন তারা। সবশেষে অক্ষরের ভগ্নিপতি মন্তব্য করেন, ‘আমাদের ভাইটি হারিয়ে গেছে। আমরা চাই, পরবর্তী দর্শনার্থীরা যেন নিরাপদভাবে ফিরতে পারে। পাশাপাশি অক্ষরের বয়োবৃদ্ধা মা যেন একটি ন্যায়সংগত আর্থিক সহায়তা পান।’
শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান শেষে বেলা পৌনে ১২টায় লাশবাহী গাড়িটি রূপসা মহাশ্মশানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। কিছুক্ষণ আগেরও যে মা আকুল হয়ে সন্তানকে কোলে চেয়েছিলেন, সেই ছয় হ্রদয়-বিদারক দৃশ্য বুকের মাঝে লুকিয়ে, গাড়িটি যখন চোখের আড়াল হয়ে গেল, তখনো স্বজনদের ভিড় সে বাসার সামনে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।




