যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কম সুদহার নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, নিজের মেয়াদে এসে সেটি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে সরব হয়েও তিনি সুদ কমানোর লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেননি। ট্রাম্প প্রায়ই উচ্চ সুদহারকে মার্কিন অর্থনীতির আকার ও শক্তির প্রতি অপমান হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিলেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর চাপ সৃষ্টি করে বলেছিলেন, সস্তা সুদ হবে প্রবৃদ্ধির জন্য ‘রকেট ফুয়েল’-এর মতো।

কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বেড়ে গেছে। এর ফলে বহু মার্কিন পরিবারের জন্য গৃহঋণ বা অটো লোন নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে, সরকারের উপরেও চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় হয়েছে ৮২৭ বিলিয়ন ডলার, যা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের চেয়েও বেশি।

এই সমস্যার গভীরতা স্পষ্ট হয় সাম্প্রতিক সপ্তাহে, যখন ট্রাম্প নিযুক্ত ফেডের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ তাঁর দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে জানান, মূল্যবৃদ্ধি এখনও ঊর্ধ্বমুখী। তবে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তিনি দিতে পারেননি।

ট্রাম্প ভোটারদের কাছে সুদহার কমানোর যে অঙ্গীকার করেছিলেন, বাস্তবে তার বিপরীত চিত্রই দেখা গেছে। ৩০-বছরের মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুক্রবার ১০-বছরের ট্রেজারি নোটের সুদ হার ৪.৭% ছাড়িয়ে গেছে, যা ক্ষমতায় আসার সময়কার চেয়েও বেশি।

তবে ট্রাম্প বেশিরভাগ সময় সুদের হার বৃদ্ধি উপেক্ষা করে অর্থনীতিকে অগ্রগতির চিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, "আমাদের এখন এ যাবত কালের সবচেয়ে সফল পরিবেশ বিরাজ করছে। বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে এরকম পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি।" উল্লেখ্য, ওই বৈঠকে ট্রাম্প বা তার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট কেউই জনসম্মুখে সুদ হারের বিষয়ে কথা বলেননি।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেসাই অবশ্য মন্তব্য করেছেন, ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি হলে শক্তির মূল্য হ্রাস পাবে এবং তার ফলে ফেড সুদের হার কমাতে পারবে। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে একটি সফল সমাধানে জোর করবেন, তখন তেলের দাম এবং এর ফলে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধিও কমে যাবে, যা ফেডের জন্য অতিরিক্ত সুদ কমানোর পথ প্রশস্ত করবে।

ক্রমবর্ধমান ঋণ গ্রহণের এই পরিস্থিতি নভেম্বরে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের জন্য বিপদজনক হয়ে দেখা দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে ট্রাম্পের নিজস্ব নীতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। গত বছর শুরু হওয়া তাঁর শুল্কারোপ নীতি সুদের হার এত দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছিল যে তিনি পিছু হতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে সেগুলো সংস্কার করেন।

ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ডেটা সেন্টার নির্মাণের জোর সমর্থন করে আসছেন। কিন্তু সেই সব প্রকল্পের অর্থায়নে ব্যবহৃত বন্ডগুলো সুদের হার বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসাথে, ইরান যুদ্ধ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ইন্ধন জুগিয়েছে।

রিপাবলিকান নেতৃত্ব আশা করেছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তারা জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাসে সুস্পষ্ট অগ্রগতি দেখাতে পারবেন। ট্রাম্প কম বেকারত্বের হার ও ভোক্তাদের মজবুত ব্যহকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারলেও, জনমানসে সেই যুক্তি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ও ইউসি বার্কলের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভোটারদের কাছে আসল বিষয় হলো তাঁদের আয় মূল্যবৃদ্ধিকে অতিক্রম করছে কিনা।

ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা ২০২৪-এর নির্বাচনে শুধু কম সুদহারই নয়, বরং দাম নিজেই কমবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু গত ১২ মাসে মূল্যবৃদ্ধির হার ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বৃদ্ধির প্রায় সমান, যা সমস্যার প্রকৃত গভীরতা পুরোপুরি তুলে ধরে না কারণ ঋণ পরিশোধের খরচ ভোক্তা মূল্য সূচকে অন্তর্ভুক্ত নয়।

আবাসন খাতের সাশ্রয়িতা ভোটারদের জন্য একটি ব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বন্ধকীদ হার কমাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ফ্রেডি ম্যাক ও ফ্যানি মেইকে অন্তত ২০০ বিলিয়ন ডলার হোম লোন কিনতে নির্দেশ দিয়েছিল। রিপাবলিকানদের আশা ছিল, ট্রাম্প একটি দ্বিদলীয় আবাসন বিলে স্বাক্ষর করবেন যখন বন্ধকী হার ৬% এর নিচে নেমে আসবে, যা আবাসনের সাশ্রয়িতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতি জনমানসিকতা উন্নত করতে পারত। কিন্তু ট্রাম্প বিলটিকে ‘বিরাট এক হাই’ বলে উল্লেখ করে স্বাক্ষর না করেই এটিকে আইনে পরিণত হতে দেন। অন্যদিকে, ফেডি ম্যাক জানিয়েছে, ৩০-বছরের বন্ধকী গড় সুদহার এখন ৬.৬৬%, যা এক বছর আগের তুলনায় অপরিবর্তিত।

বাজার বর্তমানে নির্বাচনের আগে সুদের হার কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না। মে থেকে ফেডের চেয়ারম্যান থাকা ওয়ার্শ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবর্তে আর্থিক বাজারগুলোকেই সুদের হার নির্ধারণ করতে দিতে তিনি সাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তিনি বলেছেন, বাজার সংশ্লিষ্টরা এখন রেফারির পরিবর্তে বল খেলতে শিখছে এবং তারা যে দিক ও মাত্রায় উপযুক্ত মনে করবে, বাজার দর সেভাবেই সাড়া দেবে।

তবে সুদের হার নিয়ন্ত্রনের জন্য সময় হয়তো ট্রাম্পের পক্ষে নেই। ফেডের পরবর্তী সুদহার নির্ধারণের বৈঠক শেষ হবে ১৬ সেপ্টেম্ব। বাজার ইঙ্গিত দিচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে ফেড কর্মকর্তারা তখন সুদ হার বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিতে পারেন।