জাপানি ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক ও আর্থিক সমন্বয়ের মাধ্যমে জাপানের পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার নিউ ইয়র্কের লেনদেন শেষে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দাম দাঁড়ায় ১৫৭.৪০, যা মে মাসের শুরুর পর সর্বোচ্চ। অথচ মাত্র দুই দিন আগেও মুদ্রাটি ১৯৮৬ সালের পর সবচেয়ে দুর্বলতম স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর উপক্রম হয়েছিল। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় টোকিওতে ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় এটি সতর্কতা সংকেত সৃষ্টি করেছিল।

ইয়েনের এই অভাবনীয় ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে সরাসরি কেনাকাটা, ব্যাংকগুলোর প্রতি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা এবং মার্কিন ট্রেজারিি সচিব স্কট বেসেন্ট ও জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামার মৌখিক সমর্থনের সমন্বয় ভূমিকা রেখেছে। হেজ ফান্ডে কর্মজীবনের সূত্রে বৈশ্বিক বাজারে জাপানের অবস্থান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখা বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইয়েনের দর প্রয়োজনের তুলনায় কম। বেসেন্ট ইয়েনকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট হয় যখন একটি ছবিতে ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তার সামনে রাখা নোটপ্যাডে “Buy Japanese Yen (JPY) $5-10 bil.” লেখা দেখা যায়।

দুই দেশের মধ্যে এই সমনিজয়ের ঘনিষ্ঠতা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সুমিতোমো মিৎসুই ট্রাস্ট ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা মিচিয়োশি কাতো বলেছেন, "বাজার কর্তৃপক্ষকে কম মূল্যায়ন করেছিল। ফটকাবাজদের জন্য এখন ইয়েন বেচা কঠিন হয়ে গেছে।" বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানা যায়, জাপানি কর্তৃপক্ষ শুক্রবার নিউ ইয়র্কের লেন্সেল চলাকালে ইয়েন কিনে ডলার বেচেছে। নিকি জানিয়েছে, জাপান সরকার ও ব্যাংক অফ জাপান (বিওজে) দ্বিতীয় দিনের মতো ইয়েন কেনায় হস্তক্ষেপ করে। অন্যদিকে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুসারে, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের পক্ষ থেকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ নিউ ইয়র্ক ইয়েন কিনতে ইউরো বিক্রি করে।

বৃহস্পতিবার ইয়েনের দর ডলারের বিপরীতে ৩ শতাংশের বেশি লাফায়, যেদিন জাপান প্রায় ৮.৪৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন (৫২.৮ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এটি টোকিওর এক দিনের ইতহাসে সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ। বেসেন্ট ফক্স বিজনেসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়েনকে “খুবই কমমূল্যদ্বিত” এবং “অত্যধিক অস্থিরতা” সুস্থকর নয় বলে মত দিলে প্রথম আলোচিত হন।

ক্রমবর্ধমান তেলের দাম, জাপানের ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বড় অর্থনীতির সুদের হারের বিশাল ব্যবধানের চাপে ইয়েন দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। এই পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হলে শুধু জাপান নয়, বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ছড়াতে পারে। জাপানের সরলার বন্ড বাজারের অস্থিরতা এবছর মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে প্রভাব ফেলেছে, যা বেসেন্টের অসন্তোষের কারণ।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য জটিলতা হলো, যদি জাপান একাই ইয়েন রক্ষার চেষ্টায় টিকে থাকে, তবে তাকে হয়তো নিজেদের ট্রেজারি ধারণের একটি অংশ বিক্রি করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ খরচের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাপানের শীর্ষ মুদ্রা কর্মকর্তা আতসুশি মিমুরার শুক্রবার জানান, তার দেশ ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কেবল “নৈতিক সমর্থনই” পাচ্ছে না। এদিকে, কাতায়ামা বেসেন্টকে “বাজারের অন্যতম জ্ঞানী বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রশংসা করেন।

এদিকে, বিওজে নিয়ামিত বৈঠকে সুদহার ১ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোট দেয়, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার ৩.৭৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। গভর্নর কাজুও উয়েদা সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনার দরজা খুলে দিলেও তিনি জোরালো কোন সংকেত দেননি। কিছু বিনিয়োগকারীর মতে, সুদের হারের ব্যবধান ইয়েনের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এভারকোর আইএসআইয়ের কৌশলবিদরা লিখেছেন, “হারের পার্থক্যের সমর্থন ছাড়া, মুদ্রা হস্তক্ষেপের প্রভাব তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী হবে।”