রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিশ্বের পরিশোধন সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে ফেলায় অদূর ভবিষ্যতে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য বহাল থাকবে। মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট এক্সনমোবিল হোল্ডিংস কর্প ও শেভরন কর্প এই সতর্কতা জানিয়েছে। সাধারণত পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে ওঠানামা করে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক পরিশোধনাগার উৎপাদনের বাইরে চলে যাওয়ায় এই সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসছে, যার ফলে তেলের দাম কমার পরও জ্বালানি পণ্যের মূল্য একগুঁয়েভাবে উঁচু রয়ে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।

এক্সনমোবিলের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা নিল হ্যানসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমানে জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে সংকটের বিষয় হলো পরিশোধন। বাজার সম্ভবত এই দিকটিতে পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে না। মেলিয়াস রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী অনেকটা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ইউক্রেনের রুশ পরিশোধনাগারে ক্রমাগত হামলা এবং চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ অশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা কার্যত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

এই পরিস্থিতির অর্থ হলো, টিকে থাকা পরিশোধনাগারগুলো চাহিদা মেটাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালানো হচ্ছে, যার ফলে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হলেও সেগুলোতে আরও জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকছে না। এর ফলাফল হিসেবে রেকর্ড পরিমাণে জ্বালানি তৈরির মার্জিন দেখা যাচ্ছে, যা পরিশোধনাগারের মালিকদের লাভবান করলেও ভোক্তাদের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রে স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে গড় পেট্রোনের দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে সাধারণ চালক এবং রাজনীতিবিদ উভয়ই হতাশ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে বড় তেল কোম্পানিগুলোর ব্যয় দ্রুত না কমানোর সমালোচনা করেছেন। ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ থেকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ২৬ শতাংশ কমলেও খুচরা পেট্রোনের দাম বছরের সর্বোচ্চ মে মাসের রেকর্ডের চেয়ে মাত্র ১০ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে।

গোল্ডম্যান শ্যাস গ্রুপের বিশ্লেষক নিল মেহতা মন্তব্য করেন যে পরিশোধন বর্তমানে পেট্রোলিয়াম ব্যবস্থার স্পষ্ট অন্তরায় এবং মার্জিন ব্যতিক্রমীভাবে ঊর্ধ্বমুখী। শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থের ভাষ্যে, আসল সংকট মাঝারি পরিশ্রুত পদার্থের বাজারেও, যার মধ্যে ডিজেল, জেট ফুয়েল ও হিটিং অয়েল অন্তর্ভুক্ত। ডব্লিউটিআইয়ের দামের পতন চার গুণ বেশি হলেও খুচরা ডিজেলের দাম এ বছরের সর্বোচ্চ সীমা থেকে মাত্র ৬ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে। ওয়ার্থ আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো শীতের আগে হিটিং তেল মজুত করতে শুরু করায় বাজার আরও আঁটসাঁট হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তার ধারণা, তৃতীয় প্রান্তিক ও সম্ভবত এর পরেও পণ্যের মূল্যে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখতে পাওয়া যাবে।

টরটোয়াস ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজার্সের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক রব থামেল জানান, পেট্রোনের মূল্য এখন তেলের দামের পরিবর্তে মজুতের (ইনভেন্টরি) স্তর ওঠানামার ওপর নির্ভর করছে। পরিশোধিত পণ্যের মজুদ ঐতিহাসিক নিম্নসীমায় পৌঁছে যাওয়ার কারণে পেট্রোনের দামে তেলের বাজারের প্রভাব কম এবং ইনভেন্টরির প্রভাব বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে।

চীনের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম পরিশোধনাগার নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস এক বৈশাষিকদের সাথে আলোচনায় বলেন, প্রায় ৫০ লক্ষ বোরেল দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় উপলব্ধ সক্ষমতা আগে কখনও এত কম দেখেননি বলে তিনি উল্লেখ করেন। খাতটি এই সংকট থেকে উত্তরণ হতে সময় লাগবে।

তবে চলতি বছর এই প্রথম নয় যখন খাত-সংশ্লিষ্টরা জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুতর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করল। কিছু বিশ্লেষক আগে বলেছিলেন হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছতে পারে, কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলেও বাস্তবে তা কাছাকাছিও পৌঁছায়নি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এক্সনমোবিলের উপকূলীয় পরিশোধনাগারগুলো ৯৫ শতাংশ এবং শেভরনের মার্কিন স্থাপনাগুলো ৯৭ শতাংশ ব্যবহারিক হারে পরিচালিত হয়েছে, যা নির্দেশ করে ত্রুটির জন্য জায়গা খুবই কম। শেল পিএলসি ওই প্রান্তিকে ১০২ শতাংশ হারে কারখানা চালালেও নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বর্তমানে এর হার কমার আশঙ্কা রয়েছে।

শেভরনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা আইমার বোনার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাজারকে আঁটসাঁট করে তুলেছে এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহের গুরুত্ব আরও জোরদার করছে। তিনি আরও বলেন, যে ধাক্কা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা (Shock absorbers) এতদিন অস্থিরতা কমিয়ে রেখেছিল, সেগুলো ক্রমাগতভাবে নি:শেষিত হচ্ছে।