মানসিক স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের জটিলতা বিশ্লেষণে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’ বা মানসিক আসক্তি সংক্রান্ত তত্ত্ব। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শৈশবের লালন-পালন ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই তত্ত্ব কীভাবে নিজের ও সঙ্গীর আচরণ বুঝে একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে, তা নিয়েই এখন সামাজিক মাধ্যমে চলছে জোর চর্চা।
লিজি নামের এক তরুণীর কাছে যেকোনো ভালোবাসার সম্পর্ক একই নিয়মে শেষ হতো। তিনি বলেন, “দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডেট পর্যন্ত গড়াতেই আমি অপর মানুষটির মধ্যে কোনো না কোনো খুঁত খুঁজে পেতাম।” সম্পর্ক যখনই একটু গভীর হতে শুরু করত এবং যে মানসিক আন্তরিকতার জন্য তিনি এতদিন আকুল ছিলেন, সেটাই হঠাৎ অস্বস্তিকর ও ভীতির মনে হতে থাকত লিজির কাছে। তখনই তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিতেন। বছরের পর বছর ধরে এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি লিজি, যতক্ষণ না তিনি ‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’র মুখোমুখি হন। এই তত্ত্বের চার ধরনের মানসিক স্বভাবের একটি হলো ‘ফিয়ারফুল-অ্যাভয়েড্যান্ট’, যার বর্ণনা পড়ে লিজির মনে হয়েছিল, বিষয়টি যেন এতদিন ধরে মেলাতে না পারা কোনো ধাঁধার হারিয়ে যাওয়া টুকরো। এই স্বভাবের মানুষরা মনে মনে কারও ঘনিষ্ঠ হতে চান ঠিকই, তবে একইসঙ্গে তাদের মনে ভয় কাজ করে যে সামনের মানুষটি হয়তো একসময় তাকে ছেড়ে চলে যাবে।
লিজি একা নন। বিশ্বজুড়ে এই অ্যাটাচমেন্ট থিওরি এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। টিকটকে ‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’ হ্যাশট্যাগ দেওয়া বিভিন্ন ভিডিও শত শত কোটি বার দেখা হয়েছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও এখন মানুষের আবেগ ও সম্পর্কের জটিলতা ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে এই তত্ত্ব। স্যালি রুনির বিখ্যাত উপন্যাস ও হিট টিভি সিরিজ ‘নরমাল পিপল’-এর মূল চরিত্র মারিয়ান ও কনলের সম্পর্ক থেকে শুরু করে স্যাম ফেন্ডার ও অলিভিয়া ডিনের রেকর্ড গড়া হিট গান ‘রেইন মি ইন’ সবখানেই এখন এই তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। গানটি শোনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিজি বলেন, “প্রথমবার গানটি শোনার পর আমি কেঁদে ফেলেছিলাম।” তার মতে, গানটিতে ফুটে উঠেছে, ভয় ভালোবাসাকে অসহনীয় করে তোলে আর অন্যদিকে পিছে পড়ে থাকা সঙ্গীর মনে তৈরি হয় গভীর বিভ্রান্তি।
১৯৫০-এর দশকে ব্রিটিশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন বোলবি প্রথম এই অ্যাটাচমেন্ট থিওরি নিয়ে আলোচনা করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, শৈশবে আমাদের দেখাশোনা করা মানুষদের (মা-বাবা বা অভিভাবক) সঙ্গে আমাদের যে বন্ধন তৈরি হয়, তা পরবর্তীতে বড় বয়সে যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা ও আচরণ নির্ধারণ করে। অভিভাবকদের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে ভালোবাসা ও সমর্থন পাওয়া গেলে মানুষ হিসেবে অন্যদের নির্ভরযোগ্য মনে করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘সিকিওর অ্যাভয়েড্যান্স’। অন্যদিকে, শৈশবে অভিভাবকের যত্ন বা আবেগ যদি অনিয়মিত বা আবেগহীন হয়, তবে মানুষ নিজেকে হতাশ বা কষ্ট পাওয়া থেকে রক্ষা করতে এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক মানসিক কৌশল বা দূরত্ব ধরে রাখার প্রবণতা গড়ে তোলে।
‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’র চারটি ধরন হলো— অ্যাংশাস বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত: এই স্বভাবের মানুষরা সবসময় প্রত্যাখাত বা পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়ে থাকেন। তারা প্রিয়জনের কাছ থেকে বারবার আশ্বস্ত হতে চান, নিজের আত্মবিশ্বাস কম অনুভব করেন এবং অন্যের আচরণের সামান্য পরিবর্তনেও খুব সংবেদনশীল হন। অ্যাভয়েড্যান্ট বা দূরত্ব ধরে রাখা: এই ধরনের মানুষরা নিজেদের স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন। আবেগের দিক থেকে প্রকাশ্য হতে বা অন্যের ওপর নির্ভর করতে তাদের কষ্ট হয়। সম্পর্ক খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলে তারা নিজের স্বাতন্ত্র্য হুমকির মুখে পড়ার ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেন। ফিয়ারফুল-অ্যাভয়েড্যান্ট বা দ্বিধাগ্রস্ত: এই ধরনের মানুষরা মনে মনে খুব গভীর সম্পর্ক চান, তবে সেই সম্পর্কে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারেন না। এক মুহূর্তে সম্পর্ক গড়তে চান তো পর মুহূর্তেই দূরে সরে যান। সিকিওর বা স্বাচ্ছন্দ্যময়: এই ধরনের মানুষরা যেকোনো সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা ও স্বাধীনতা দুটোর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে পারেন। তারা অন্যকে বিশ্বাস করতে পারেন, নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে এবং দরকারে অন্যের সহায়তা নিতে পারেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘সিকিওর’ স্বভাবের মানুষরা কেবল রোমান্টিক সম্পর্কই নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তুলনামূলক ভালো করেন। তারা চাপ সামলাতে পারেন, প্রত্যাখ্যান বা ছেড়ে চলে যাওয়ার মানসিক আঘাত সহজে কাটিয়ে ওঠেন এবং কর্মক্ষেত্রে ভালো সহকর্মী বা ব্যবস্থাপক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। সম্পর্ক বোঝার এই মনস্তাত্ত্বিক উপায়টি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও প্রভাব ফেলছে। সামাজিক মাধ্যমে অ্যাটাচমেন্ট থিওরি ব্যবহার করে মানুষ যেমন বন্ধুত্ব বা পারিবারিক টানাপোড়েন বিশ্লেষণ করছেন, তেমনই ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও সঙ্গীকে যাচাই করছেন। ‘রিলেশনশিপ কোচ’রাও এখন ‘ইমোশনালি আনঅ্যাভেইলেবল’ বা আবেগহীন সঙ্গীর লক্ষণ চেনা বা এই মানসিক জটিলতা থেকে বের হওয়ার নানাবিধ পরামর্শ দিচ্ছেন।
‘ইউনিভার্সিটি অফ এসেক্স’-এর মনোবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. পাসকাল ভ্রিতিকা প্রায় দুই দশক ধরে ‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’ নিয়ে গবেষণা করছেন। মানুষের সমর্থন চাওয়া ও ঘনিষ্ঠতা তৈরির আচরণের ভিন্নতা বুঝতে এই তত্ত্বকে তিনি ‘অন্যতম সেরা ব্যাখ্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও এর ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তার মতে, এর ভুল ব্যবহার অনেক সময় ‘অনুপযোগী ও ক্ষতিকর’ হয়ে উঠতে পারে। ড. পাসকাল জানান, অন্যতম বড় ভুল ধারণা হলো, মানুষ ধরে নেয় এই অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল বা মানসিক স্বভাব সারাজীবনের জন্য নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনটা স্থায়ী হলেও এতে পরিবর্তন আনা সম্ভব, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে বা জীবনে বড় কোনো পরিবর্তনের মুখে, যেমন নতুন সম্পর্ক, বিচ্ছেদ বা প্রিয়জনের বিয়োগের মতো ঘটনা এই স্বভাবে পরিবর্তন আনতে পারে। “গবেষণায় দেখা গেছে সিকিওর বা স্বাচ্ছন্দ্যময় স্বভাবটি সবচেয়ে বেশি স্থায়ী। অর্থাৎ একবার নিজেকে এই জায়গায় নিয়ে আসতে পারলে তা ধরে রাখা সহজ হয়।” তবে যাদের মানসিক জটিলতা গভীরে, তাদের জন্য পেশাদার থেরাপিস্টের সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে।
এইসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের সূক্ষ্ম দিকগুলোই আজকাল সামাজিক মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন লিজি। তিনি বলেন, অনেকে হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ও মানুষকে নির্দিষ্ট ‘লেবেল’ বা ট্যাগ দিয়ে বিবেচনা করেন। লিজির ভাষ্য, নিজের আত্মসচেতনতা বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। “যেমন আমি জানি, আমার এড়িয়ে চলার প্রবণতা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। ফলে এই মুহূর্তে কারো সঙ্গে প্রেম করা আমার জন্য ঠিক হবে না।” তবে এর মানে এই নয় যে, এই স্বভাবের মানুষরা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন না। লিজি বলেন, ‘নিজেকে চেনা ও ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার জন্য কাজ করার দায়িত্বটা সম্পূর্ণ নিজের’।
জনপ্রিয় বই ‘অ্যাটাচড’-এর সহ-লেখক ড. আমির লেভিন তার নতুন বইয়ে একটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, মানুষ কীভাবে সিকিওর্ড বা স্বাচ্ছন্দ্যময় সম্পর্কের স্বভাব তৈরি করতে পারেন? তিনি বলেন, এর বড় একটি উত্তর লুকিয়ে আছে ‘সিমি’ নামের আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ছোটখাটো মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে। যেমন, ছুটির দিনগুলো কেমন কাটল তা জানতে চেয়ে বন্ধুর পাঠানো মেসেজ বা অচেনা কারও একটু হাসি। ড. লেভিন বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় এইসব ছোটখাটো যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করে, যা নিরাপত্তার জন্য তৈরি এক নজরদারি ব্যবস্থা।” এইসব অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সম্পর্কের প্রতি মস্তিষ্কের প্রত্যাশা তৈরি করে। ইতিবাচক বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় প্রমাণ মেলে, মানুষকে বিশ্বাস করা যায়, যা কাউকে ‘সিকিওর মোড’-এর দিকে নিয়ে যায়। এর বিপরীতে, মেসেজের উত্তর পেতে দেরি হওয়া বা কথা দিয়ে কথা না রাখা স্নায়ুতন্ত্রে এক ধরনের সূক্ষ্ম চাপ তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে নিজের ‘অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ বা মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। ফলে ড. লেভিন এমন সম্পর্কগুলো চেনার পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তি নিজে ইতিবাচক ও নিরাপদ বোধ করছেন, যেন সেগুলোকে ভিত্তি করে পুরো জীবনে ‘সিকিওর’ স্বভাব গড়ে তোলা যায়।
‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’কে কেবল শৈশবের অভিজ্ঞতার ফল হিসেবে না দেখে বর্তমান সম্পর্কের মাধ্যমে ‘সিকিওর্ড’ হওয়া সম্ভব, এমন ধারণা এখন জোর পাচ্ছে। অনেকেই এই থিওরি জেনে পরিবারকে দোষ দেওয়া শুরু করেন। তবে লেভিন বলেন, “শৈশব কোথায় শুরু হয়েছিল কেবল সেটাই মুখ্য নয়, এরপর কী ঘটছে সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।” এ ছাড়া, ড. লেভিন মনে করেন ‘ইনসিকিওর’ বা অনিশ্চিত স্বভাবের মানুষেরও কিছু নিজস্ব শক্তি রয়েছে। যেমন, অ্যাংশাস বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্বভাবের মানুষরা অন্যের মেজাজ বা আচরণের সূক্ষ্ম পরিবর্তন খুব দ্রুত ধরে ফেলেন এবং অ্যাভয়েড্যান্ট বা দূরত্ব ধরে রাখা মানুষরা বেশ স্বাধীনচেতা হন এবং চাপের মুখেও ভালো কাজ করেন। ড. পাসকাল মনে করিয়ে দিয়েছেন, এগুলোকে ভালো-খারাপের চশমায় না দেখলেও এর বিভিন্ন ঝুঁকি বা অসুবিধা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অ্যাটাচমেন্ট থিওরি নিজেকে কেবল একটি ট্যাগে আটকে রাখার জন্য নয়, বরং নিজের আচরণ ও সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্যই সবচেয়ে কার্যকর।




