মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টাভিত্তিক একজন ইনফ্লুয়েন্সার ও উদ্যোক্তা ইয়াহদান ইয়াদা স্ত্রীকে গৃহস্থালি কাজের জন্য বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং প্রতিবার গর্ভধারণের জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা প্রদান করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। তিনি নিজের পরিবারের বসার ঘরেই এই ব্যতিক্রমী আর্থিক চুক্তিটি সম্পন্ন করেন, যা সাধারণত করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বোর্ডরুমে হয়ে থাকে। ইয়াদা তাঁর স্ত্রী আজা ইয়াদার জন্য গৃহস্থালি কাজ ও সন্তান লালন-পালনের মতো দীর্ঘদিনের অবৈতনিক দায়িত্বকে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক মূল্যে পরিণত করেছেন, যার ফলে এটি বছরে কয়েক লাখ ডলারের একটি পেশায় রূপ নিয়েছে। এই ব্যবস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং পরিবার, নারী-পুরুষের ভূমিকা ও বৈবাহিক সম্পর্ককে অর্থনৈতিক কাঠামোয় দেখার বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ইয়াহদান ইয়াদা ভাইরাল হওয়ার আগে বিকল্প স্বাস্থ্যচর্চার কোচ, লাইফস্টাইল কনটেন্ট নির্মাতা এবং নিজেকে 'মিনিস্টার' বা ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। তিনি একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী (সিইও), যা প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের বিষাক্ত উপাদান দূর করা এবং শারীরিক সুস্থতা নিয়ে কাজ করে। তাঁর বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ইকুয়েডরে একটি বিশেষ ডিটক্স ভিলেজ গড়ে তোলা এবং একটি বিলাসবহুল পাহাড়ি ডিটক্স রিসোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে @yada_awakening নামে পরিচিত ইয়াদা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনার মাধ্যমে আত্মভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে একটি অনলাইন কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন।

ইয়াদার দর্শনের মূলনীতি তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গঠিত: ভরণপোষণ—একজন পুরুষের উচিত জীবনকে স্থিতিশীল করার পরই সঙ্গী বেছে নেওয়া; সুরক্ষা—একজন পুরুষের দায়িত্ব তাঁর সঙ্গীকে শারীরিক ও মানসিক চাপ থেকে রক্ষা করা; এবং পূর্ণ সম্মান—মাতৃত্ব কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়, এটি সপ্তাহের সাত দিন, দিনের ২৪ ঘণ্টার একটি কঠিন ও পূর্ণকালীন কাজ। ইয়াদা প্রায়ই বলেন, তাঁর শৈশব কেটেছে মানসিক কষ্ট ও পারিবারিক সংকটের মধ্যে। তিনি এমন বহু পরিবার দেখেছেন, যেখানে অস্থিতিশীল সঙ্গীর কারণে নারীদের অন্যায্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বোঝা বহন করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বড় হয়ে পুরুষের দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের দর্শন গড়ে তোলেন। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজে নারীদের একই সঙ্গে চাকরি, গৃহস্থালি কাজ এবং সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করতে হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর বিনিময়ে তাঁরা পুরুষের কাছ থেকে প্রকৃত দায়িত্বশীলতা বা সম্মান পান না।

শুধু মুখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে ইয়াদা তাঁর বিশ্বাসকে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামোয় রূপ দিয়েছেন। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বেতনব্যবস্থার আদলে তিনি স্ত্রীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পারিশ্রমিক ব্যবস্থা চালু করেছেন। বার্ষিক মূল বেতন হিসেবে সংসার পরিচালনা ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব পালনের জন্য আজা ইয়াদা বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ কোটি টাকার সমান এবং এই অর্থের ওপর ইয়াহদান ইয়াদার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিটি গর্ভধারণের জন্য তিনি অতিরিক্ত ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি টাকার সমান; ইয়াদার মতে, গর্ভধারণের শারীরিক কষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আর্থিক স্বীকৃতি হিসেবেই এই অর্থ দেওয়া হয়। এছাড়াও, প্রতিটি সন্তানের জন্য ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দেওয়া হয়। স্ত্রীর সুস্থতা ও ব্যক্তিগত সময় নিশ্চিত করতে ইয়াদা একজন ব্যক্তিগত শেফ, গৃহপরিচারিকা, স্টাইলিস্ট, মাসিক কেনাকাটার বাজেট এবং বছরে সম্পূর্ণ ব্য�়ভার বহন করা ছুটির ব্যবস্থাও করেন। বর্তমানে এই দম্পতি তাঁদের পঞ্চম সন্তানের অপেক্ষায় আছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, সব মিলিয়ে আজা ইয়াদার পারিবারিক পারিশ্রমিক বছরে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইয়াদার এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। সমর্থকদের মতে, পূর্ণকালীন গৃহিণী ও মায়েদের অদৃশ্য পরিশ্রমকে তিনি যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এই ব্যবস্থা নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি নতুন দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এটি বৈবাহিক সম্পর্ককে আবেগের জায়গা থেকে সরিয়ে একটি ব্যবসায়িক লেনদেনে পরিণত করেছে। কেউ কেউ মনে করেন, যেখানে একজন স্বামী কার্যত নিয়োগকর্তার ভূমিকায় থাকেন, সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার অনেকে পুরো বিষয়টিকেই তাঁর স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যবসার প্রচারের জন্য পরিকল্পিত জনসংযোগ কৌশল বলেও মনে করছেন। সব বিতর্কের পরও ইয়াহদান ইয়াদার এই পারিবারিক অর্থনৈতিক মডেল গৃহস্থালি শ্রমের মূল্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। তাঁর মতে, প্রকৃত বৈবাহিক সমতা শুধু কথায় নয়, আর্থিক স্বীকৃতির মাধ্যমেও প্রকাশ পাওয়া উচিত।