প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ এখন সারাক্ষণই অনলাইনে সংযুক্ত থাকলেও, ভেতরের দিক থেকে তারা আগের চেয়ে বেশি একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান নিঃসঙ্গতা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অভাবকে মনস্তত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় 'ফ্রেন্ডশিপ রিসেশন' বা 'বন্ধুত্বের মন্দা' বলা হচ্ছে। রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই নিঃসঙ্গতা শুধু একটি সাময়িক মানসিক অবস্থা নয়; বরং এটি একটি নীরব বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট যা মানুষের আয়ুষ্কালের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের 'ব্লিসফুল মাইন্ডস সাইকিয়াট্রিক সার্ভিসেস'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ওমোটোলু আজে-ওমোকোরে জানান, তার চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা অনেক রোগীই পরিবার বা বন্ধু দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও তীব্র একাকিত্ব অনুভব করেন। এই মনোবিদের মতে, বর্তমান যুগে বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যস্ত ক্যারিয়ার ও পারিবারিক দায়িত্ব। কঠোর পেশাগত জীবন, সন্তান বা পরিবারের যত্ন নেওয়ার ব্যস্ততা এবং ঘন ঘন বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে মানুষ অজান্তেই বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়।
এছাড়াও মস্তিষ্কের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া এক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। আচরণগত স্নায়ুবিজ্ঞানী ও 'আনস্টপেবল ব্রেইন' বইয়ের লেখক ডা. কায়রা বোবিনেট ব্যাখ্যা করেন, অনেকেই জানেন বন্ধুদের সাথে সময় কাটালে ভালো লাগবে, কিন্তু তাদের অবচেতন মন সেই কাজে বাধা দেয়। অতীতে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া, অবহেলা বা বন্ধু হারানোর তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে মস্তিষ্ক নতুন করে কারো সাথে সংযোগ স্থাপনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।
একাকিত্বের শারীরিক ক্ষতির কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ইউএস সার্জন জেনারেলের অফিস একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে মহামারী স্তরের একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 'এএনকে বিহেভিয়ারেল হেলথ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাইকিয়াট্রিক নার্স প্র্যাকটিশনার অ্যালিসা কিলিয়ন একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগের অভাব বা একাকিত্ব শরীরে প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। বন্ধুত্বের অভাব মানুষকে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও বার্নআউট থেকে রক্ষার স্বাভাবিক বর্মটি কেড়ে নেয়।
এই মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ উপায়ের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, যোগাযোগের লক্ষ্য সহজ রাখতে হবে। অনেকেই কোনো বড় কারণ বা পরিকল্পনা ছাড়া বন্ধুকে মেসেজ দিতে দ্বিধা করেন। ডা. বোবিনেটের মতে, বন্ধু যদি মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করে বা না-ও দেয়, তবে সেটিকে ব্যক্তিগত প্রত্যাখ্যান হিসেবে না নেওয়াই ভালো। প্রত্যাশা কমিয়ে শুধু একটি সাধারণ 'হ্যালো' বা ছোট টেক্সট পাঠানোর মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ গলানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নড়াচড়ার সাথে আড্ডার মেলবন্ধন তৈরি করা। ব্যস্ত রুটিন থেকে আলাদা করে সময় বের করা কঠিন হলে, দৈনন্দিন কাজের সঙ্গেই বন্ধুকে যুক্ত করা যেতে পারে। যেমন, সন্ধ্যার হাঁটা, বাজারে যাওয়া বা খোলা জায়গায় বসে চা পান—এমন সহজ কাজে কোনো পুরনো বন্ধুকে সঙ্গী করলে বিনা চাপেই নিয়মিত আড্ডা হয়ে যায়। তৃতীয়ত, পুনরাবৃত্তিমূলক রুটিন তৈরি করা। ডা. ওমোটোলু আজে-ওমোকোরের মতে, বড় কোনো আয়োজনের চেয়ে ছোট, ধারাবাহিক মুহূর্তগুলো সম্পর্ককে বেশি মজবুত করে। তাই বন্ধুদের সাথে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একটি নির্দিষ্ট দিনে আড্ডা, খেলাধুলা বা হাঁটার গ্রুপ তৈরির মতো নিয়মিত রুটিন শুরু করা উচিত। সময়ের সাথে সাথে এটি মানুষের মনের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।




