জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট-ময়নার মোড় সড়কটি এখন কাদাপানিতে পরিণত। ইটশূন্য এই পথে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার কারণে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অথচ কয়েক মাস আগেও এখানে ইটের তৈরি একটি ব্যবহারযোগ্য রাস্তা ছিল। এই অবস্থার পেছনে রয়েছে এক অভিনব প্রতারণার কাহিনি।

গত ১২ মে ওই সড়ক পাকাকরণের নামে একটি জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন)। এলাকার দলীয় নেতা-কর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও অংশ নেন। সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে জানানো হয়, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়কটি নির্মাণ করবে। আর আবদুল মান্নান নামের এক ব্যক্তি সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবেন।

উদ্বোধনের পরদিন থেকেই মান্নানের লোকজন পুরোনো সড়কের ইট তুলে বিভিন্ন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে শুরু করে। তবে নির্মাণকাজের কোনো অগ্রগতি না দেখে এলাকাবাসীর মনে সন্দেহ জাগে। পরে তারা বুঝতে পারেন—এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা মাত্র। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো রাস্তার ইট অপসারণ করে তা বিক্রি করে দেওয়া। সংসদ সদস্য মামুন প্রথম আলোকে জানান, এলাকাবাসীর অনুরোধে তিনি উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি কিছু বুঝতে পারেননি। পরে এলজিইডির প্রকৌশলী ও ইউএনও’র কাছে দরপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁর সন্দেহ হয়। তখনই তিনি লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেন এবং মূল হোতাসহ ১১ জনকে ধরিয়ে পুলিশে দেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন বলেও দাবি করেন তিনি।

রশিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য জামিল হাসান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য ও নেতাদের উপস্থিতিতে কারও সন্দেহ হয়নি। এমন প্রতারণা হবে—একটুও ভাবতে পারেননি তারা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন গ্রামের মানুষ, কারণ রাস্তাটি এখন চলাচলের অযোগ্য। তবে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম উদ্বোধনে থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রুহুল আমিন বলেন, এটা দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা এবং বিষয়টি অত্যন্ত হাস্যকর।

একই কায়দায় চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট চুরির চেষ্টা চালায় ওই চক্র। আগের মতো সেখানে নেতাদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন করে কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু গজারিআটার ঘটনা জানাজানি হওয়ায় এলাকাবাসী মান্নানের কাছে প্রকল্পের কার্যাদেশ ও চুক্তিপত্র দেখতে চান। কোনো বৈধ নথি দেখাতে না পারায় ক্ষুব্ধ জনতা তাকে ও তার ১০ সহযোগীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার জানান, তিনি উদ্বোধনের বিষয়টি জানতেন না। সংসদ সদস্য একদিন জানতে চাইলে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেন সেখানে কোনো কাজ হচ্ছে না। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে এবং মামলা হয়। এলজিইডির জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বিষয়টি ফেসবুকে দেখেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ওই সড়কে কোনো উন্নয়নকাজের দরপত্রই হয়নি। ইট না থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। দ্রুত রাস্তাটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জামালপুরের নারায়ণপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক মো. মঞ্জুরুল খান বলেন, গজারিআটার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে চাঁদপুরের ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে তারা সবাই জামিনে আছেন। মামলাটির তদন্ত চলছে। মূলহোতা আবদুল মান্নান (৫০) জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন গা ঢাকা দিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন এবং সম্প্রতি এলাকায় ফিরে ঠিকাদার পরিচয় দেন। পুলিশ তাঁকে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের কোথাও একটি ইট নেই। কাদাপানি আর বর্ষার পানিতে পথ চেনা দায়। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা বা অন্য কোনো যান চলতে পারছে না। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে কাদা মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা সবুজ মিয়া ধানের বস্তাবোঝাই সাইকেল কাদার মধ্যে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি বলেন, এই রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করাই কষ্টকর। বর্ষা থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা চেনার উপায় নেই। প্রতিদিনই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।