চট্টগ্রাম নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত অনেকেই এখন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রান্না করছেন, কেউ আবার দিনের কাজের সময়সূচি পিছিয়ে দিচ্ছেন। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা পাইপলাইন গ্যাসের অপেক্ষা না করে এলপিজি সিলিন্ডার ও চুলা কিনে নিচ্ছেন। ফলে গত এক সপ্তাহে নগরীতে এলপিজি সিলিন্ডারের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে নগরে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রি হলেও এখন সেই সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

জামালখান এলাকার বাসিন্দা চন্দনা চৌধুরী জানান, ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে রান্না করেন তিনি। সকাল আটটার পর থেকে বাসায় গ্যাস থাকে না। তিনি বলেন, এত বড় সংকট তিনি আগে কখনো দেখেননি। কখন গ্যাস আসবে সেই হিসাব করে এখন চলতে হচ্ছে, ফলে ঘুম ও খাওয়াদাওয়া সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। একই অবস্থা হালিশহরের বাসিন্দা আমেনা বেগমের। বেলা ১১টার দিকেও তার চুলায় গ্যাসের চাপ এত কম ছিল যে রান্নার কোনো কাজই করা যাচ্ছিল না।

গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন যারা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। কাজীর দেউড়ি এলাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন কোহিনূর বেগম। তিনি বলেন, গ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। বিকেলে গ্যাস এলে তখন তাকে কাজে যেতে বলা হচ্ছে, ফলে কাজও জমে যাচ্ছে এবং পরিশ্রমও বেড়ে গেছে।

আগ্রাবাদের বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল হোসাইনের বাসায় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকট চলছে। দিনের বেলায় বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো ও নিজেদের অফিসে যাওয়ার সময় রান্না নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছিলেন তারা। শেষ পর্যন্ত দুই দিন আগে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার ও একটি চুলা কিনেছেন। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা। স্বল্প বেতনে চাকরি করা রাসেল বলেন, হঠাৎ এই অতিরিক্ত খরচ তার মাস শেষে পকেটে টান ধরাবে। মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নূরনবীও দিনের পর দিন গ্যাসের অপেক্ষার ঝামেলা থেকে বাঁচতে সম্প্রতি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন।

আতুরার ডিপো এলাকার দোকানি জানে আলম জানান, তার দোকানে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৫০ থেকে ৭০টি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হতো। গত ১১ আগস্ট বিক্রি হয়েছে ৯০টি, ১২ আগস্ট ৮৬টি এবং ১৩ আগস্ট ৯২টি। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তার দোকানে গড়ে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। নতুন অনেক গ্রাহক এলপিজি কিনছেন, যাদের বাসায় আগে পাইপলাইনের গ্যাসের চুলা ছিল। ফলে তাদের সিলিন্ডারের সঙ্গে এলপিজির উপযোগী চুলাও কিনতে হচ্ছে, এতে চুলার বিক্রিও বেড়েছে। তবে সিলিন্ডার সরবরাহে কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন টেকনিক্যাল এলাকার মেসার্স মোহাম্মদিয়া ট্রেডিংয়ের মালিক মুহাম্মদ আলী আজম এবং ষোলশহরের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মোহাম্মদ সোহেল। তারা বলছেন, চাহিদা বাড়লেও সরকার নির্ধারিত দামেই সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে।

এই দুর্ভোগের মূল কারণ চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহের বিশাল ঘাটতি। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় পেয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ চট্টগ্রামে ন্যূনতম দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে মিলছে মাত্র ৪৩ শতাংশ গ্যাস, দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে। গত ২১ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে সরবরাহ ক্রমাগত কমছে। ওই সময় দৈনিক প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল, যা এখন ঠেকেছে ১৫ কোটি ঘনফুটে। ফলে আবাসিকের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও সরবরাহ ও চাপ কমেছে।

আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এক্সিলারেটের দুটি বয়লারের মধ্যে অক্ষতটি মেরামত শেষে ৬ আগস্ট চালু করা হলেও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যটি চালুর কাজ চলছে। এর মধ্যে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে সামিটের টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে। গত সোমবার এলএনজিবাহী একটি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে এলেও বৈরী আবহাওয়ায় টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর করা যায়নি। অন্যদিকে এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টার্মিনালটির গ্যাস সরবরাহ টানা ৭২ ঘণ্টা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। তবে সেই কাজ কবে শুরু হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা সূত্র।