চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে গত জুলাইয়ে পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যার পর এবার স্থায়ী পানিনিষ্কাশন ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ওই দুর্যোগে উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে পাউবো ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নতুন প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ এই ডিপিপি তৈরি করেছে এবং অনুমোদনের জন্য আগামী সপ্তাহে এটি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হবে।
‘চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার ঐতিহাসিক জলকদর খাল খননসহ পোল্ডার ৬৪-এর টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামে প্রস্তাবিত এই উদ্যোগে ৯০ কিলোমিটারের বেশি খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ঈশ্বরবাবুর হাট থেকে সরল সেতুর ভাটিতে ২০ কিলোমিটার জলকদর খাল খনন করা হবে, যা বাঁশখালীর পানিনিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ। পাশাপাশি ছনুয়া ও গোবিন্দ খালসহ অন্যান্য শাখা খালে আরও ৭০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার খননের প্রস্তাব আছে। খাল খননের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে জলকদর খালের জন্য ৯৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার এবং শাখা খালের জন্য ৫৬ কোটি ৩২ লাখ ২৯ হাজার টাকা নির্ধারিত।
স্লুইসগেট ও বাঁধ সংস্কারেও ব্যাপক কাজ রাখা হয়েছে। বর্তমানে বাঁশখালীতে পাউবোর ৭০টি স্লুইসগেট ও রেগুলেটর রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪৬টি সচল, ১৩টি আংশিক সচল এবং ১১টি সম্পূর্ণ অকেজো। অকেজো ১১টি গেট পুনর্নির্মাণ এবং ১৪টি গেট প্রতিস্থাপন করা হবে, যার জন্য ৪৯৯ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বাহারছড়া, কাথারিয়া, সরল, চাম্বল ও গণ্ডামারা ইউনিয়নে ৭৬ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ব্যয় ৬৪ কোটি ৭০ লাখ ১৫ হাজার টাকা। গণ্ডামারা, বাহারছড়া ও ছনুয়া ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৯৭৫ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধের ঢাল সুরক্ষার জন্য ৪৭৪ কোটি ৫৩ লাখ ১ হাজার টাকা এবং পুকুরিয়া, সাধনপুর ও খানখানাবাদ ইউনিয়নে ৩ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ১৬২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
গত ৫ থেকে ১২ জুলাই চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওই বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৪১ জনের মৃত্যু ঘটে এবং ১৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাঁশখালী ও চকরিয়া ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে। পাউবোর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ জানান, বর্তমান স্লুইসগেটগুলোর আকার অনেক ছোট হওয়ায় বন্যার পানি ধীরগতিতে নামতে পারে। ভবিষ্যতে জলকদর খাল ও এর সঙ্গে যুক্ত খালগুলো পুনঃখনন, অকেজো গেট সরিয়ে নতুন গেট স্থাপন এবং খালের দুই পাশে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, এসব কাজ সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে এবারের মতো পরিস্থিতি এড়ানো যাবে।
এই নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বর্তমানে ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ নামে ৮৭৪ কোটি টাকার একটি কাজ চলমান রয়েছে। চার বছর আগে উপকূলের বাঁধ সংস্কারে ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়েছিল। অন্যদিকে, পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, উপকূলে নির্মিত বাঁধগুলো মূলত সমুদ্রের জোয়ার ঠেকানোর জন্য তৈরি, কিন্তু ভেতরের বৃষ্টির পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, এখন বাঁধ ও স্লুইসগেটগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে পুনর্নির্মাণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাইরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কাজ করানো উচিত, কারণ পূর্বের কাজগুলো ঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও তিনি জোর দেন।




