বরিশাল নগরের সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিং কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল আজিজ হাওলাদারকে তাঁর নিজ কক্ষে চা পান করার সময় আকস্মিকভাবে চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি প্রবেশ করেন। তারা কক্ষে উপস্থিত অন্যদের বের করে দেন এবং একজন কালো জামা পরিহিত ব্যক্তি আবদুল আজিজকে জাপটে ধরে চড়–থাপ্পড় মারাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তাঁর শরীরের সংবেদনশীল স্থান চেপে ধরে দুটি চেক ও দুটি নন–জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করেন।
ভুক্তভোগী আবদুল আজিজ হাওলাদার জানান, ওই ব্যক্তির নাম মোস্তাফিজুর রহমান (লিটু), তিনি নগরের কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর ভাই মাহবুবুর রহমান (পিন্টু) বরিশাল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। আবদুল আজিজের দাবি, একসময় মোস্তাফিজুর তাঁদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। তিন বছর আগে বিনিয়োগের বিপরীতে মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে সমপরিমাণ জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে সব হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়। ওই সময় কোনো পাওনা নেই বলে মোস্তাফিজুর অঙ্গীকারনামাও দেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তিনি এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। হিসাব আগেই চূড়ান্ত হওয়ায় তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মোস্তাফিজুর তাঁর সহযোগীদের নিয়ে অফিসে ঢুকে মারধর করে এবং জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়।
ঘটনার পর আবদুল আজিজ ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেক থেকে টাকা তোলা সম্ভব হয়নি। তিনি গত বৃহস্পতিবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহ মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার রোববার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদেশের কপি ওইদিনই থানায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে ঘটনার বিস্তারিত ধরা পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আবদুল আজিজ তাঁর কক্ষে বসে চা পান করছিলেন এবং দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় চারজন যুবক কক্ষে প্রবেশ করেন। কালো জামা পরা মোস্তাফিজুর রহমান সবার শেষে এসে প্রথমে অন্যদের বাইরে বের করে দেন। এরপর তিনি আবদুল আজিজকে চেয়ারে বসা অবস্থায় জাপটে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। আবদুল আজিজ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে আরেক ব্যক্তি তাঁর পা টেনে ধরেন। পরে তিনি দাঁড়িয়ে গেলে মোস্তাফিজুর তাঁকে একাধিকবার চড় মারেন। এরপর কথোপকথন চললেও তা স্পষ্ট নয়। মারধরের একপর্যায়ে মোস্তাফিজুর আবদুল আজিজের শরীরের সংবেদনশীল স্থানে হাত দেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তখন তাঁর অণ্ডকোষ চেপে ধরা হয় এবং চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেওয়া হয়। পরে তাঁকে ওই কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়। ঘটনার সময় আবদুল আজিজ ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে একজনকে ডাকতে শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাঁকে আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেক ও স্ট্যাম্প গ্রহণের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়। তখন মোস্তাফিজুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘হাসেন... হাসেন।’
এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। তাঁর ভাই মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঘটনার বিস্তারিত জানেন না, তবে শুনেছেন তাঁর ভাই ওই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে ব্যবসা করে এবং অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী আবদুল আজিজ থানায় এসে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন এবং আদালতের আদেশের কাগজ রোববার থানায় পৌঁছাতে পারে বলে তিনি জানান।




