ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি সময়ে শরীর যখন ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্কের কিছু অংশ পুরোপুরি বিশ্রামের সংকেত পাঠাতে পারে না। স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের নিউরোমেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. ইসরাত জেরিন আলম ব্যাখ্যা করেন, এই সময়ে মস্তিষ্ক শরীরের পতনকে ভুলভাবে বিপদের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ফলে পেশিগুলোকে সংকুচিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়—যদিও ব্যক্তি বিছানায় নিরাপদেই শুয়ে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই আকস্মিক প্রতিক্রিয়াকে ‘হিপনিক জার্ক’ বলা হয়; এটি আসলে মস্তিষ্কের একটি ‘মিসফায়ার’ বা ভুল সংকেত। বিশেষ করে রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম—যা পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে—ঘুম ও জাগরণের সীমারেখায় পুরোপুরি বিশ্রাম অবস্থায় না যাওয়ার কারণেই এই ভুল সংকেত পাঠায়।

এই ঘটনায় ঘুমের মধ্যে অনেকের হঠাৎ মনে হয়, তিনি বুঝি পড়ে যাচ্ছেন। তখন শরীরের যেকোনো একটি পাশ নড়ে ওঠে; হাত-পা কেঁপে ওঠে। এই নড়াচড়ায় ব্যক্তির নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। চমকে গিয়ে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। অস্বস্তিও হতে পারে। শোয়া অবস্থায় এমনটি ঘটলেও কারও মনে হতে পারে, তিনি দাঁড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে যাচ্ছেন, কিংবা হাঁটতে হাঁটতে পতিত হচ্ছেন। সেই মুহূর্তে একটি স্বপ্নসদৃশ আবেশের মধ্যে থাকতে পারেন—যা ঠিক স্বপ্ন নয়; বরং হ্যালুসিনেশন বা ভ্রম। কখনো পাশে থাকা মানুষটি এই আকস্মিক নড়াচড়া টের পেয়ে চমকে ওঠেন, যদিও আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুম না-ও ভাঙতে পারে।

বিশ্বব্যাপী গবেষকরা মনে করেন, হিপনিক জার্কের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের জীবনে কখনো না কখনো এই অভিজ্ঞতা হয়। সাধারণত শৈশবের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পরই এ ঘটনা বেশি ঘটে। তবে এটি মস্তিষ্কের কোনো বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে নয়। বরং মস্তিষ্কের বিশ্রামে বাধা হয়ে দাঁড়ানো কিছু বিষয়ে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়—যেমন মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ঘুমের ঘাটতি, ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম, নিকোটিন, অ্যালকোহল এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন। চা ও কফির পাশাপাশি এনার্জি ড্রিংক ও চকলেটেও ক্যাফেইন থাকে, যা ঘুমের আগে এড়িয়ে চলা জরুরি।

হিপনিক জার্ক হলে মস্তিষ্ক বা শরীরের কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয় না। তবু বিষয়টি অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এটি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস মেনে চললে ঘটনা কমিয়ে আনা যায়। মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমাতে ইতিবাচক চিন্তা করুন। ঘুমানোর আগে ধ্যান করতে পারেন, হালকা ধরনের বই পড়তে পারেন, কুসুম গরম পানিতে গোসল করতে পারেন অথবা পোশাক বদলে নিতে পারেন। রোজ একই সময়ে ঘুমাতে ও উঠতে চেষ্টা করুন—ছুটির দিনেও এই নিয়ম মানুন। ঘরের তাপমাত্রা যেন অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। নিয়মিত শরীরচর্চা করুন; কিন্তু ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন। ধূমপান এবং অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে দূরে থাকুন। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করবেন না।

চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে তখন, যখন ঘুমের সময় শুধু হিপনিক জার্ক নয়, অন্য কোনো ধরনের নড়াচড়া বা খিঁচুনি দেখা দেয়। জেগে থাকা অবস্থায়ও যদি শরীরের কোনো পেশি কেঁপে ওঠে বা নড়ে ওঠে, তাহলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। ঘুমের মধ্যে যদি কেউ চিৎকার করেন, ধস্তাধস্তি করেন, পাশের মানুষকে আঘাত করেন, কোনো কিছু খাওয়ার চেষ্টা করেন বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক কাজ করেন—এসব লক্ষণ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এছাড়া ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা বা ‘নাইট ব্রুকসিজম’ থাকলেও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।