প্রখ্যাত শিল্পী মুর্তজা বশীরের জন্মদিন উপলক্ষে তার স্মৃতিতে এক আবেগঘন নিবেদন প্রকাশ করেছেন চিত্রশিল্পী নাজলী লায়লা মনসুর। নিজের শিল্পী পরিচিতির পেছনে তিনজন গুরু—রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর ও দেবদাস চক্রবর্তীর অবদানকে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা চারু ও কারুকলা কলেজে ভর্তি হলেও এক বছর পরই পড়া ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাকে। সাধারণ শিক্ষায় আইএ ও বিএ সম্পন্ন করার পর জানতে পারেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় দুই বছরের এমএ কোর্স চালু করেছেন রশিদ চৌধুরী। সেখানে প্রথম দিনই রুটিনে ছিল শিল্পমাধ্যমের ক্লাস, যেটি নেওয়ার কথা ছিল মুর্তজা বশীরের। ক্লাসে ঢুকে শিক্ষককে না দেখে টিচার্স রুমে গিয়ে বিষয়টি জানালে ভীষণ বকা খান তিনি। প্রথমে ভয় পেলেও পরে বুঝতে পারেন, স্যারের বাহ্যিক রাশভারী ভাবের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ ও বন্ধুসুলভ একটি মানুষ।
মুর্তজা বশীরের শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল অনন্য। ছবি আঁকার সময় তিনি বলতেন, শিল্পীর আঁকা মানুষ বাস্তব নয়, তাই তাদের গায়ের রং নীল, সবুজ কিংবা বেগুনিও হতে পারে। আলোর উৎস না থাকলেও ছবিতে যেকোনো জায়গায় ছায়া দেওয়া যায় বলেও শেখাতেন তিনি। তবে ড্রয়িংয়ে ছিল স্যারের বিশেষ দক্ষতা। তিনি ব্যাখ্যা করতেন, পৃথিবীতে আসলে রেখা বলে কিছু নেই—পাহাড়ের সামনে গাছ, গাছের সামনে ঘর, ঘরের সামনে মানুষ—এই সবকিছুকে ছবিতে আলাদা করতে সীমারেখা বা আউটলাইন ব্যবহার করতে হয়। মানুষটির আসল দেহগঠন ফুটিয়ে তুলতে হলে রেখার শুরু ও শেষ, তার পাশ দিয়ে নতুন রেখার সূচনা কোথায়—সবকিছু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে আঁকতে হবে। রেখা কখনো গাঢ়, কখনো হালকা করতে হবে, নইলে মানুষের স্থূলতা বা কৃশতা, এমনকি তার চরিত্রও ফুটে উঠবে না।
ড্রয়িং শেখানোর সময় স্যার ইরেজার ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন। ভুল লাইন ইরেজার দিয়ে মুছে বারবার ঠিক করে আঁকতে বলতেন, যাতে বারবার সংশোধনের মাধ্যমে লাইনটি মুখস্থ হয়ে যায়। পরে মন থেকে ফিগার আঁকতে আর কোনো বেগ পেতে হতো না। তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের হাতের নানা ভঙ্গির ড্রয়িং করার পরামর্শ দিতেন, যা অনুশীলনে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করেন নাজলী লায়লা মনসুর। এছাড়া স্যার বলতেন, মডেল সব সময় পাওয়া যায় না, তাই আয়নার সামনে আত্মপ্রতিকৃতি আঁকার অভ্যাস করতে হবে। তিনি নিজেও জীবনের নানা বয়সে অসংখ্য আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন। পুরোনো মাস্টারদের কাছ থেকে শেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলতেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, রাফায়েলদের কাজ ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে; আর চিত্রশৈলী নিয়ে কাজ করতে হলে পাবলো পিকাসোর কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে—অনুকরণ নয়, অনুধাবনই আসল উদ্দেশ্য।
রেনেসাঁপূর্ব শিল্পীদের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল মুর্তজা বশীরের। তাদের কম্পোজিশন, ড্রয়িং ও রঙের ব্যবহার নিয়ে তার আগ্রহ ছিল অগাধ, কারণ অবয়বধর্মী স্টাইলিস্টিক কাজে সেখান থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। অন্যদিকে প্রাচ্য শিল্পকলা, বিশেষত মোগল মিনিয়েচারে পরিপ্রেক্ষিত ব্যবহারের কৌশল ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে তিনি ছিলেন গভীর জ্ঞানসম্পন্ন। শিক্ষার্থীদের তিনি বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করতেন। ছাত্রজীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অক্ষয় বট’ নামে ঝামা ইট দিয়ে সৃষ্টি করা স্যারের অসাধারণ এক প্রাচীরচিত্র দেখার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নাজলী লায়লা মনসুর। বিশ্বে ইট দিয়ে এত বড় অথচ সংযত প্রাচীরচিত্র সৃষ্টি হয়েছে কিনা সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মোজাইকের কাজে লাইন অনুসরণের যে বৈশিষ্ট্য, সেই কাজে তা স্পষ্ট। সৃষ্টি থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত মুদ্রার ইতিহাস বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাচীরচিত্রে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাও তিনি অতুলনীয় বলে মন্তব্য করেন।
শুধু চিত্রশিল্পী নন, মুর্তজা বশীর ছিলেন একাধারে ড্রয়িংমাস্টার, পেইন্টার, প্রিন্টমেকার, কবি, গল্পকার; চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার ও সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান মুদ্রাবিশেষজ্ঞ। নানা দেশের মুদ্রা, ডাকটিকিট, দেশলাইয়ের বাক্স—কত রকম জিনিসের যে সংগ্রহ ছিল তার! এসবের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্বও শতভাগ পালন করেছেন। মুর্তজা বশীরের সরাসরি ছাত্র হতে পেরে নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান ও গর্বিত মনে করছেন এই শিল্পী।




