গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাতে অন্ধকার, ফ্রিজ বা ওয়াই-ফাই রাউটার চালু রাখার সমস্যা—এসব ঝামেলা এড়াতে অনেকেই এখন ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর কথা ভাবছেন। কিন্তু বাজারে ঢুকলেই দেখা যায় কত রকমের সোলার সিস্টেম! ১০০, ২০০, ৫৫০ ও ৬০০ ওয়াটের প্যানেল, মনোক্রিস্টালাইন, এন-টাইপ, বাইফেসিয়াল—কী নেই এখানে। সঙ্গে ব্যাটারি, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার, তার আর ইনস্টলেশনের খরচ যোগ হলে আদতে কত টাকা লাগে, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়।

একটি পূর্ণাঙ্গ সোলার ব্যাকআপ সিস্টেমে শুধু প্যানেলই যথেষ্ট নয়। সোলার প্যানেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ সরাসরি ঘরের ফ্যান, বাতি বা ফ্রিজে ব্যবহার করা যায় না। সিস্টেমের ধরন অনুযায়ী দরকার হয় ব্যাটারি, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার এবং প্রয়োজনীয় তার। ইনভার্টার ডিসি বিদ্যুৎকে এসি বিদ্যুতে রূপান্তর করে, আর ব্যাটারি দিনের বেলার তৈরি বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখে, যাতে রাতেও ব্যবহার করা যায়। তাই তিন হাজার টাকায় একটি প্যানেল কিনলেই সোলার ব্যাকআপ মিলে যাবে—ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।

ছোট একটি পরিবারের জন্য যদি লক্ষ্য থাকে লোডশেডিংয়ের সময় দুটি ফ্যান, দুটি বাতি এবং মুঠোফোন বা রাউটার চালানো, তাহলে ১৫০ ওয়াটের প্যানেল, ৪০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি, ৫০০ ওয়াটের ইনভার্টার ও চার্জ কন্ট্রোলার দিয়ে একটি স্টার্টার সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে। তবে আরেকটু বড় পরিসরে—দুটি ফ্যান, দুটি বাতি ও একটি ফ্রিজ চালানোর জন্য ৩০০ ওয়াটের প্যানেল, ১০০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি, ৮০০ ওয়াটের ইনভার্টারসহ সিস্টেমের খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অবশ্য এগুলো নির্দিষ্ট বাজারদর নয়; বরং সম্ভাব্য সিস্টেমের একটি উদাহরণ মাত্র। ব্র্যান্ড, ব্যাটারির ধরন, ইনস্টলেশন খরচ বদলালে মোট খরচও বদলে যাবে।

বাজারে বর্তমানে ১০০ ওয়াটের কিছু মনোক্রিস্টালাইন প্যানেল ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন—লংর্যান ব্র্যান্ডের ১০০ ওয়াট প্যানেলের দাম ৩ হাজার টাকা, সুপার স্টারের ক্ষেত্রে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ৮০০ টাকা, আর রহিমআফরোজের ১৫০ ওয়াটের মনো প্যানেল সাড়ে ১২ হাজার টাকায়। তবে শুধু একটি ১০০ ওয়াটের প্যানেল দিয়ে লোডশেডিংয়ের সময় ফ্যান-বাতি চালানোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা পাওয়া যাবে না; কারণ এর জন্য কত ক্ষমতার ব্যাটারি ও ইনভার্টার লাগবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

২০০ ওয়াটের প্যানেলের দাম ব্র্যান্ডভেদে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। জেনেটিক ব্র্যান্ডের একটি ২০০ ওয়াট প্যানেল সাড়ে ৬ হাজার, ওয়ালটনের ২০০ ওয়াট প্যানেল ৬ হাজার ৭০০ টাকা। ২৫০ ওয়াটের গ্রামীণ সোলারের দাম ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, বড় ক্ষমতার প্যানেলের বাজার এখন বেশ গতিশীল। ৫৮০ ওয়াটের জিংকো টাইগার নিও এন-টাইপ প্যানেল প্রায় ১০ হাজার ৪০০ টাকা, লংগি ৫৮০ ওয়াটের মডেল প্রায় ১২ হাজার টাকা এবং জিংকোর ৬২৫ ওয়াটের বাইফেসিয়াল প্যানেল সাড়ে ১৫ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে শুধু ওয়াট দেখে দাম তুলনা করা ঠিক হবে না; ব্র্যান্ড, সেল প্রযুক্তি, ওয়ারেন্টি ও দক্ষতার কারণে দামে বড় পার্থক্য থাকতে পারে।

মজার ব্যাপার হলো, প্যানেলের ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি ওয়াটের দাম অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। ১৫০ ওয়াটের প্যানেলের প্রতি ওয়াট দাম ৪০-৫৭ টাকা হলেও ৫৫০ ওয়াটের ক্ষেত্রে তা ২৭-৩৮ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সবার জন্য সবচেয়ে বড় প্যানেলটিই সেরা। ছাদে জায়গা, দিনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ, ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

ব্যাকআপ সিস্টেমে ব্যাটারির দামও বড় একটি বিষয়। আপনি যদি শুধু দিনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে চান, তাহলে ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা একরকম; কিন্তু রাতে বা লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখতে চাইলে ব্যাটারির ক্ষমতা অনুযায়ী খরচ বাড়বে। একইভাবে, ইনভার্টারের ক্ষমতা নির্ভর করবে আপনি একসঙ্গে কী কী চালাতে চান তার ওপর। ফ্যান, বাতি, রাউটারের সঙ্গে ফ্রিজ বা টিভি চালাতে চাইলে সেই যন্ত্রগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা হিসাব করতে হবে। তাই বিক্রেতার কাছে যাওয়ার আগে পুরো লোডের তালিকা নিয়ে যাওয়াই ভালো।

প্রযুক্তির দিক থেকে বাজারে এখন মনোক্রিস্টালাইন, এন-টাইপ ও বাইফেসিয়াল—নানা ধরনের প্যানেল রয়েছে। জিংকো, লংগি, তৃণা, জেএ সোলার, কানাডিয়ান সোলারের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ৫০০-৭০০ ওয়াটের মডেল পাওয়া যায়। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) নেট মিটারিংয়ের অনুমোদিত তালিকায়ও এসব ব্র্যান্ডের মডেল আছে। তবে শুধু 'এন-টাইপ' বা 'বাইফেসিয়াল' লেখা দেখে বেশি টাকা খরচ করা উচিত নয়; আপনার জায়গা, রোদ পাওয়ার পরিমাণ ও পুরো সিস্টেমের নকশা বিবেচনা করেই প্রযুক্তি বেছে নেওয়া উচিত।

সোলার ব্যবহারের আরেকটি পদ্ধতি হলো নেট মিটারিং। এতে ছাদের প্যানেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা হয় এবং দ্বিমুখী মিটার সেটির হিসাব রাখে। এ ক্ষেত্রে ব্যাটারি ছাড়াই গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত সিস্টেম পরিচালনা করা সম্ভব। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে নেট মিটারিংয়ের আওতায় ইতিমধ্যে হাজারের বেশি রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন হয়েছে। তাই বিদ্যুৎ বিল কমানোর উদ্দেশ্যে ব্যাটারিসহ অফ-গ্রিড সিস্টেম আর নেট-মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সিস্টেম—দুটির হিসাব এক নয়।

সোলার সিস্টেম কেনার আগে ছয়টি বিষয় মনে রাখা জরুরি: প্যানেলের ওয়াট নয়, পুরো সিস্টেমের হিসাব দেখতে হবে; একই ওয়াটের প্যানেলের দাম আলাদা হতে পারে, তাই স্রেডার অনুমোদিত মডেল যাচাই করা ভালো; ওয়ারেন্টির কাগজে পারফরম্যান্স ওয়ারেন্টি নাকি পণ্যের ওয়ারেন্টি, তা পরিষ্কার হতে হবে; ইনস্টলেশনের খরচ আলাদাভাবে জেনে লিখিত কোটেশন নেওয়া উচিত; ভবিষ্যতে আরও যন্ত্র যোগ করার সম্ভাবনা মাথায় রেখে সিস্টেম ডিজাইন করা ভালো; আর ইনভার্টার-ব্যাটারিতে সমস্যা হলে কে সার্ভিস দেবে, তা নিশ্চিত হতে হবে।

সব মিলিয়ে, শুধু প্যানেল কিনতে চাইলে কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করা যায়—১০০ ওয়াট প্যানেল প্রায় ৩ হাজার টাকা, ২০০ ওয়াট ৬-৭ হাজার, ৫৮০-৬৫০ ওয়াটের ভালো ব্র্যান্ডের প্যানেল ১০-১৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম চাইলে ছোট সিস্টেমের জন্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা, মাঝারি ব্যবহারে ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি খরচ হবে। দীর্ঘ ব্যাকআপ বা বেশি যন্ত্র চালাতে চাইলে খরচ আরও বাড়বে। তাই সোলার কিনতে গিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আমার কী কী চালাতে হবে, কতক্ষণ চালাতে হবে এবং তার জন্য পুরো সিস্টেমের কত খরচ হবে? এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব।