সুস্থ থাকার নামে বাজারে এখন নানা রকম সাপ্লিমেন্ট, সুপারফুড আর স্বাস্থ্যসম্মত দাবির ছড়াছড়ি। প্রতিদিনই কে কোন খাবার খাচ্ছেন, কোনটিতে কতটা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, কোন সাপ্লিমেন্টে শক্তি বাড়ে কিংবা কোন 'সুপারফুড' দ্রুত ওজন কমায় — এমন নানা বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ, ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যের বিক্রেতারা যেন স্বাস্থ্য নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো কথা বললেই তা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হয়ে যায় না। এ জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গবেষণা, আর নিউট্রিশন সায়েন্স বলছে, দামি সুপারফুড নয়, বরং সহজলভ্য দৈনন্দিন খাবারের মাধ্যমেই সুস্থ থাকা সম্ভব।

একজন রত্ন বিক্রেতা স্বাভাবিকভাবেই তার পণ্যের সৌন্দর্য, বিশেষত্ব কিংবা কথিত উপকারিতার কথা বলেন, কারণ সেটিই তার ব্যবসা। কিন্তু ক্রেতা হিসেবে আমরা সাধারণত শুধু বিক্রেতার কথায় সিদ্ধান্ত নিই না; দাম, মান, প্রয়োজন সবকিছু বিবেচনা করি। খাদ্য-সাপ্লিমেন্ট কিংবা তথাকথিত 'সুপারফুড'-এর ক্ষেত্রেও এই একই বুদ্ধি কাজে লাগানো উচিত। কোনো পণ্য বিক্রির সময় যখন বলা হয় এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে, দ্রুত ওজন কমাবে, বয়সের ছাপ কমাবে কিংবা শরীরকে 'ডিটক্স' করবে, তখন শুধু দাবিটি আকর্ষণীয় বলেই তা বিশ্বাস করার কারণ নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই দাবির পেছনে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কী?

সাধারণভাবে একজন সুস্থ মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রধান উৎস হওয়া উচিত বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবার। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ বা দুধজাত খাবার, বাদাম ও বীজ — খাবারের বৈচিত্র্য যত বেশি থাকে, বিভিন্ন পুষ্টি পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে কারওই সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন নেই। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শে নির্দিষ্ট ভিটামিন বা খনিজের সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে। কোনো পুষ্টির ঘাটতি, নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাসজনিত সীমাবদ্ধতা কিংবা বিশেষ জীবনপর্বে অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন হলে সাপ্লিমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রয়োজন থাকা আর শুধু ভালো থাকার আশায় নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট খাওয়া — এই দুটি কিন্তু এক বিষয় নয়।

'প্রাকৃতিক' শব্দটি শুনলেই অনেক সময় আমরা কোনো পণ্যকে নিরাপদ মনে করি, কিন্তু এখানেই সতর্ক হওয়া জরুরি। প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া কোনো উপাদানও শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় কিছু ভিটামিন ও খনিজ গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে, আবার কিছু ভেষজ বা সাপ্লিমেন্ট নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াও করতে পারে। কোনো পণ্যের গায়ে 'প্রাকৃতিক', 'হারবাল' বা 'অর্গানিক' লেখা থাকলেই সেটি সবার জন্য নিরাপদ — এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

'সুপারফুড' শব্দটিও একটু সাবধানে দেখার বিষয়। শব্দটি শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, এর বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা ততটা নির্দিষ্ট নয়। কোনো একটি খাবারে বিশেষ কোনো পুষ্টি বেশি থাকতে পারে, কিন্তু সেটি একাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প হয়ে যায় না। ব্লুবেরি, চিয়া সিড, কুইনোয়া কিংবা অন্য কোনো জনপ্রিয় খাবার খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের পরিচিত স্থানীয় খাবার — শাকসবজি, ডাল, ফল, মাছ, ডিম, বাদাম, বিভিন্ন বীজ ও পূর্ণ শস্যও হতে পারে পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। স্বাস্থ্যকর খাবারের মূল্য শুধু তার 'সুপারফুড' পরিচয়ে নয়, বরং পুরো খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্য ও ভারসাম্যে।

কোনো জনপ্রিয় তারকা বা ইনফ্লুয়েন্সার একটি সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করছেন কিংবা কোনো স্বাস্থ্যপণ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলছেন — এটি সেই পণ্য আপনার জন্য প্রয়োজনীয় বা কার্যকর হওয়ার প্রমাণ নয়। কারও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সত্যি হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এক জিনিস নয়। তাই স্বাস্থ্যপণ্য কেনার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত — এটি কি সত্যিই আমার প্রয়োজন? দাবিটির পেছনে নির্ভরযোগ্য গবেষণা আছে কি? এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি আছে কি? আমার ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত কি না? এই প্রশ্নগুলোই অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে পারে।

সুস্থ থাকার ধারণাটিকে আমরা অনেক সময় অকারণে জটিল করে ফেলি। দামি পাউডার, বিদেশি খাবার কিংবা অসংখ্য সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনটা দেখা দরকার। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ধূমপানসহ ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকা — স্বাস্থ্যকর জীবনের ভিত্তি অনেকটাই এখানেই। স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো দাবি যত আকর্ষণীয়ই শোনাক, সেটিকে যাচাই করার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। কারও ব্যবসায়িক স্বার্থ, কারও জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝকঝকে প্রচারণা যেন আমাদের স্বাস্থ্যবোধের জায়গা দখল না করে। সুস্থ থাকার জন্য সবসময় সবচেয়ে দামি জিনিসটি নয়, বরং যেটি সত্যিই প্রয়োজন, সেটিই বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।