নতুন ভাষা শেখা শুধু শব্দ বা বাক্য মুখস্থ করার বিষয় নয়; এটি মস্তিষ্কের নিয়মিত অনুশীলন, যা মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও দক্ষ করে তোলে। বার্সেলোনায় ‘ফেডারেশন অব ইউরোপিয়ান নিউরোসায়েন্স সোসাইটিজ’ সম্মেলনে উপস্থাপিত সাম্প্রতিক এক গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, যারা একাধিক ভাষায় কথা বলেন তাদের মস্তিষ্ক বয়সের তুলনায় অনেকটাই তরুণ থাকে। এমনকি স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার লক্ষণও তাদের মধ্যে দেরিতে দেখা দিতে পারে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের ক্ষয়ের হারও কিছুটা ধীর হয়। এই গবেষণাটি এখনো বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার অপেক্ষায় থাকলেও এর ফলাফল ইতিবাচক বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলেন বিয়ালিস্টক পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাষা ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, গান গাওয়া বা সংগীতচর্চার মতো দিনে কয়েক ঘণ্টার অনুশীলনের চেয়ে একাধিক ভাষা জানা থাকলে মস্তিষ্ককে প্রায় সারাক্ষণই ভাষা নিয়ে কাজ করতে হয়। ফলে মানসিক অনুশীলন বেশি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় কথা বলেন, তবে ইংরেজিতে কথা বলার সময়ও মস্তিষ্কে বাংলা ভাষাটি সক্রিয় থাকে। কোন ভাষার কোন শব্দটি ব্যবহার করা উচিত, কোনটি বাদ দেওয়া উচিত — মস্তিষ্ককে একসঙ্গে এই সবকিছুর হিসাব রাখতে হয়।

স্পেনের বাস্ক সেন্টার অন কগনিশন, ব্রেইন অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজের ভাষাবিজ্ঞান গবেষক লুসিয়া আমোরুসো বলেছেন, দ্বিভাষী মানুষের ক্ষেত্রে একটি ভাষায় কথা বলার সময় অন্য ভাষাটি মস্তিষ্কে ঘুমিয়ে থাকে না; সেটিও সক্রিয় থাকে। তিনি নিজে স্প্যানিশ, ইংরেজি, ফরাসি ও ইতালীয় ভাষায় কথা বলতে পারেন। ইংরেজিতে কথা বলার সময় তাঁকে নিজের মাতৃভাষা স্প্যানিশকে সাময়িকভাবে চাপা দিতে হয়। মাথার মধ্যে ভাষা পরিবর্তনের কোনো ‘সুইচ’ নেই বলেই একাধিক ভাষা একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে এবং মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোন ভাষাটি ব্যবহার করা হবে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, একাধিক ভাষায় কথা বলা মানুষের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বেশি। শিশুদের ক্ষেত্রেও এই অনুশীলন শুরু হয় খুব ছোট বয়সে। দুই ভাষায় কথা বলে এমন পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা মাত্র সাত মাস বয়সে ভাষার পরিবর্তন বুঝতে পারে এবং মনোযোগ সংক্রান্ত পরীক্ষায় এক ভাষায় কথা বলা পরিবারের শিশুদের তুলনায় তারা ভালো ফল করে। একাধিক ভাষা জানার কারণে মস্তিষ্ক সব সময় একটু কঠিন কাজের মধ্যে থাকে, ফলে ধীরে ধীরে এটি আরও দক্ষ হয়ে ওঠে।

একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় কম শক্তি ব্যবহার করেও একই কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এক ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ মেপে দেখা গেছে, দুই ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্কে সামগ্রিকভাবে কম কাজ হয়, তবে মনোযোগ থাকে বেশি। অন্য গবেষণাতেও প্রায় একই ফল পাওয়া গেছে, যেখানে একাধিক ভাষা জানা মানুষ এক ভাষা জানা মানুষের তুলনায় কম সক্রিয় থেকেও মনোযোগের সহজ কাজগুলো সমানভাবে করতে পেরেছেন। ছোট বয়সে এই দক্ষতা খুব কাজে না লাগলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ বয়স বা আলঝেইমারের মতো রোগের কারণে মস্তিষ্কের কাজের গতি কমতে পারে এবং আগে থেকে দক্ষ মস্তিষ্ক সেই ধাক্কা সহজে সামলে নিতে পারে।

মস্তিষ্কের বয়স কমে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গত বছর নেচার এজিং জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকেরা ৮৬ হাজারের বেশি মানুষের মস্তিষ্কের ছবি ও জৈবিক তথ্য ব্যবহার করে মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করেছিলেন। ২৭টি ইউরোপীয় দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব দেশে মানুষ বেশি ভাষায় কথা বলে, সেসব দেশে মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি তুলনামূলকভাবে ধীর। শুধু একটি ভাষায় কথা বলা মানুষের ক্ষেত্রে দ্রুত মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। তবে এই গবেষণা ছিল দেশভিত্তিক, তাই পরবর্তী গবেষণায় একই গবেষকেরা ৭২৮ জন মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের তথ্য ব্যবহার করেন। তাতে দেখা গেছে, দুই বা তিনটি ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্ক গড়ে প্রায় ছয় বছর কম বয়সী মনে হয়েছে, আর চারটি ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্কের বয়স প্রায় ১৩ বছর কম বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আজ থেকে চারটি ভাষা শেখা শুরু করলেই মস্তিষ্ক ১৩ বছর তরুণ হয়ে যাবে; এটি একটি অনুমানভিত্তিক মাপ, যার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, একজন যে ভাষাগুলো জানেন, সেগুলো পরস্পরের কাছাকাছি হলে (যেমন বাংলা ও অসমিয়া) মস্তিষ্কের সুরক্ষার সম্পর্ক তত বেশি হতে পারে, কারণ কাছাকাছি ভাষাগুলোর পার্থক্য করতে মস্তিষ্ককে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

একাধিক ভাষা জানার আরেকটি বড় সুবিধা হলো ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’, অর্থাৎ বয়স বা রোগের কারণে মস্তিষ্কে পরিবর্তন এলেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক ভাষায় কথা বলা মানুষের ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার রোগ দেরিতে ধরা পড়ে — কিছু গবেষণা বলছে এই ব্যবধান চার-পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। মস্তিষ্কে আলঝেইমারের মতো পরিবর্তন দেখা গেলেও দুই ভাষায় কথা বলা ব্যক্তি কয়েক বছর পর্যন্ত এর প্রভাব জীবনে তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করেন। তবে এর মানে এই নয় যে ভাষা শিখলেই ডিমেনশিয়া হবে না; এটি বরং মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

নতুন ভাষা শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই; যেকোনো বয়সে যে কেউ শুরু করতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও নতুন ভাষা শেখা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। আর নতুন ভাষায় একেবারে দক্ষ বা সাবলীল হওয়া জরুরি নয়; যত বেশি সময় ধরে এবং যত নিয়মিত ভাষাটি ব্যবহার করা যায়, তত বেশি মানসিক অনুশীলন হয়। কোরিয়ান সিরিজ বা জাপানিজ কমিক পছন্দ করেন এমন শিক্ষার্থীরা এই ভাষাগুলো শেখা শুরু করতে পারে, স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে অনুশীলন করা যেতে পারে, অথবা ভাষা শেখার অ্যাপ, সিনেমা, সিরিজ বা গানের মাধ্যমেও নতুন ভাষার উচ্চারণ ও শব্দের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সহজ। তবে শুধু শব্দ বা বাক্য মুখস্থ করলে শেখা হবে না; ভাষাটি ব্যবহার করেই শিখতে হবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।