দেশের নদ-নদী রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে (এনআরসিসি) আরও কার্যকর করতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া ছয় বছর পেরিয়েও শেষ হয়নি। ২০২০ সালে আইনটি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও খসড়া নিয়ে অনুষ্ঠিত সাতটি বৈঠকের পরও তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। গত ১২ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে খসড়াটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমিশনে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা এনআরসিসির ক্ষমতা বর্তমানে মূলত সরকারি সংস্থাগুলোকে নদী রক্ষায় সুপারিশ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০১৬ সালে একটি রিটের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত কমিশনকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন এবং একইসঙ্গে নদীর 'অভিভাবক' হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে নতুন আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত আইনে নদীকে 'সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণা, নদী আদালত প্রতিষ্ঠা এবং নদী-সংক্রান্ত উন্নয়ন কাজ ও কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্পের ক্ষেত্রে কমিশনের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার মতো বিধান রাখা হয়েছে।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে এনআরসিসি খসড়া আইন প্রস্তুত করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। এরপর ২০২২ সালের ১২ মে প্রথম আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত মোট সাতটি সভা হয়েছে — যার মধ্যে চারটি আন্তঃমন্ত্রণালয় এবং তিনটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সভা। সর্বশেষ সভায়ও আইনটি চূড়ান্ত না হওয়ায় বিভিন্ন সংস্থার আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে খসড়াটি পুনরায় এনআরসিসিতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নদীকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা এবং নদী আদালত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সংস্থাটির বক্তব্য, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০১০ (সংশোধিত) অনুযায়ী এই কাজগুলো তারা করে থাকে। একই ক্ষমতা নতুন করে কমিশনকে দেওয়া হলে দুই সংস্থার মধ্যে দায়িত্বের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে তারা। অন্যদিকে, নদী-সংক্রান্ত প্রকল্প ও কারিগরি কাজের আগে কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধানের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। তাদের অভিযোগ, এতে কাজে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও দ্বৈততা সৃষ্টি হবে। জরুরি ভিত্তিতে নৌপথ ড্রেজিংয়ের মতো কাজে এনওসি নিতে গেলে দেরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। তবে সভার কার্যবিবরণীতে দ্বৈততার প্রকৃত কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন শাখার উপপরিচালক খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী জানান, তরল বর্জ্যে নদীদূষণ রোধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেয়। খসড়া আইনে দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও নদী দখল ও ভরাটের তদারকির বিষয়টি থাকতে পারে বলে তিনি মত দেন। তবে পরিবেশ আদালতে দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকায় আলাদা নদী আদালত দ্বৈততা তৈরি করবে বলে তার সংস্থার ধারণা।

বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনে নদী উন্নয়ন প্রকল্প বা কাজের আগে নদী কমিশনের অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যার বিরোধিতা তারা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় করেছেন। জরুরি নৌপথ খননের কাজে এনওসি নিতে গেলে অযথা বিলম্ব হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিব মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, নদীর নাব্যতা রক্ষা, দখল ও দূষণ রোধে সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার কারণেই উচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্য পূরণে কমিশনের তদারকির ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। কয়েকটি সংস্থার আপত্তির কথা স্বীকার করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, কমিশনকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সবকিছুসহ আইনটি পাস হবে।

প্রস্তাবিত আইনে ২০১৩ সালের বিদ্যমান আইনের ২১টি ধারার মধ্যে ১৬টি সংশোধনের কথা বলা হয়েছে এবং নতুন আরও ১৭টি ধারা যুক্ত হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, বিদ্যমান আইনের ৭৬ শতাংশ পরিবর্তন করায় নতুন করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ। খসড়ায় কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দূষণকারী ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও প্রস্তাব করা হয়েছে।