সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী অন্তত সাতটি এলাকার প্রায় তিন হাজার পরিবার টানা এক মাস ধরে পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে রাস্তাঘাট, বাড়ির উঠান এমনকি অনেকের বসতঘরেও পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
সাতক্ষীরা পৌরসভার কামালনগর, ইটাগাছা, পলাশপোল, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, রইচপুর ও মধ্য কাটিয়ার নিম্নাঞ্চল এবং সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের শৈলকের বিল-সংলগ্ন এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ হয়ে রয়েছে বলে ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানিয়েছেন। সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খানের মতে, প্রায় তিন হাজার পরিবারের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ এই পানিবন্দী অবস্থার শিকার। তাঁর ভাষ্য, পানিনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে টানা দুই সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়। সাতক্ষীরা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮ জুলাই একদিনেই সর্বোচ্চ ১৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুলফিকার আলী জানান, ১ জুলাই থেকে গতকাল ১৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত জেলায় মোট ৮৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
শনিবার বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘুড্ডেরডাঙ্গী মোড় এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন বসতবাড়ির চারপাশে দীর্ঘদিনের জমে থাকা পানি। কোথাও পানির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে শুকনো পাতা ও আবর্জনা। বেশ কয়েকটি টিনের ঘরের সামনের অংশও পানিতে ডুবে আছে। এর আগে বুধবার সকালে সদর উপজেলার তালতলা, মাগুরা ও ইটাগাছা এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় তিনজন বাসিন্দার সঙ্গে আলাপে জানা যায়, অপরিকল্পিত চিংড়ির ঘের নির্মাণের কারণে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, কালভার্ট ও স্লুইসগেটের ত্রুটি এবং নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
ইটাগাছা এলাকায় রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা প্লাস্টিকের ভেলায় পারাপার হচ্ছে। এলাকার বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে বর্ষা এলেই এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এবার রান্নাঘরেও পানি ঢুকেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ছিল না। তখন বিল দিয়ে পানি খালে নেমে যেত। পরে বিভিন্ন স্থানে ঘের নির্মাণের কারণে কালভার্টের মুখে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। একসময় পানিনিষ্কাশনের প্রধান পথ ছিল কৈখালী ও শৈলকের বিল। গত আট-নয় বছরে সেখানে মাছের প্রায় ১৫টি ঘের হওয়ায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, আগে সারা দিন বৃষ্টি হলেও আধা ঘণ্টায় পানি বেতনা নদীতে নেমে যেত। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থাকে। নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য (সাতক্ষীরা–২) আবদুল খালেকের কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। গত মঙ্গলবার যুগিপোতা উন্নয়ন সংগঠনের আয়োজিত এক সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। অনেক জায়গায় নিজেদের জমিতে ঘের বা বাঁধ দিয়ে পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করা হচ্ছে। একজন মানুষের কারণে শত মানুষকে কষ্ট পেতে দেওয়া যায় না। বাড়িঘর নির্মাণের সময়ও পানি চলাচলের পথ রাখতে হবে।
জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। সম্প্রতি জেলা নাগরিক কমিটি আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় নদী-খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পুনর্খনন, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অপরিকল্পিত ঘের নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়।
ভুক্তভোগীদের আন্দোলনের মুখে গত মঙ্গলবার কয়েকটি ঘেরের একাংশ কেটে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, এটি সাময়িক সমাধান; খাল ও পানি চলাচলের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত না হলে প্রতিবছর একই দুর্ভোগ থাকবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে উল্লেখ করে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ১৮ আগস্ট সাতক্ষীরায় এসে বিষয়গুলো সরেজমিনে দেখবেন। তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




