ছোট্ট পিঁপড়াদের মস্তিষ্ক পিনের মাথার চেয়েও ছোট হয়, কিন্তু তারা কীভাবে খাবার খুঁজে পায় এবং আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে—এই কৌতূহল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বেভারলি ভিস্তা মিডল স্কুলের অষ্টম গ্রেডের ছাত্রী সিউংআ চুং একটি মজার পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে তার পরীক্ষার জন্য ২০০টি লাল হারভেস্টার পিঁপড়া সংগ্রহ করে এবং একটি গোলকধাঁধা তৈরি করে। সোসাইটি ফর সায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, এই গবেষণায় দেখা গেছে, লাল হারভেস্টার পিঁপড়ারা উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করে না, বরং তাদের চোখের সামনের বিভিন্ন চিহ্ন দেখে পথ চিনে নেয়। এই অসাধারণ গবেষণার জন্য সিউংআ যুক্তরাষ্ট্রের মিডল স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিখ্যাত স্টেম প্রতিযোগিতা ২০২৫ থার্মো ফিশার সায়েন্টিফিক জুনিয়র ইনোভেটরস চ্যালেঞ্জে ফাইনালিস্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

পিঁপড়াদের সারিবদ্ধভাবে চলাফেরা দেখে সিউংআর মনে প্রশ্ন জাগে—এর পেছনে আসল রহস্যটা কী? বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন যে পিঁপড়ারা ফেরোমোন নামের এক ধরনের রাসায়নিক গন্ধ ছেড়ে যায়, যা শুঁকে অন্য পিঁপড়ারা তাদের অনুসরণ করে। কিন্তু সিউংআ জানতে চেয়েছিল, পথ চলার এটাই কি একমাত্র উপায়, নাকি পিঁপড়ারা চারপাশের বস্তু দেখেও পথ চিনতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে নিজে একটি নতুন পরীক্ষার পরিকল্পনা করে।

গবেষণার জন্য সে ২০০টি লাল হারভেস্টার পিঁপড়া নিয়ে টি (T) আকৃতির একটি গোলকধাঁধা তৈরি করে। ভেতরে খাবারের পুরস্কার হিসেবে এক টুকরো কমলালেবু রেখে দেওয়া হয়। প্রতিবারে ১৫টি করে পিঁপড়া গোলকধাঁধায় ছেড়ে দেওয়া হতো। তবে গোলকধাঁধার পথটি ফাঁকা ছিল না, বরং পথের ধারে কৃত্রিম কিছু চিহ্ন বসানো হয়েছিল—প্লাস্টিকের পাতা, ছোট সামুদ্রিক পাথর এবং রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা ব্লক। এই জিনিসগুলো দৃশ্যমান চিহ্ন বা ল্যান্ডমার্ক হিসেবে কাজ করত, যাতে পিঁপড়ারা দেখে পথ চিনতে পারে। পিঁপড়াদের গোলকধাঁধাটি চেনার ও ঘুরে দেখার সময় দেওয়ার পর সিউংআ পর্যবেক্ষণ করে দেখে, তারা সঠিক পথটি মনে রাখতে পারছে কি না। কোনো ভুল ফলাফল এড়াতে বারবার একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করে সে।

পরীক্ষার সবচেয়ে মজার অংশটি শুরু হয় যখন পিঁপড়ারা খাবারের জায়গা চিনে ফেলল। সিউংআ খাবারটি সরাল না, বরং গোলকধাঁধার ভেতরের পাথর ও নকল পাতাগুলোর অবস্থান বদলে দিল। পিঁপড়ারা যদি শুধু ডানে বা বাঁয়ে যাওয়ার কথা মনে রাখত, তাহলে চিহ্নগুলো বদলালে তাদের সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টোটা—চিহ্নগুলোর জায়গা বদলে দেওয়ার পর অনেক পিঁপড়া পথ হারিয়ে ফেলল। খাবার একই জায়গায় থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু পিঁপড়া ভুল পথে চলে গেল। এই আচরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, তারা শুধু মোড় নেওয়ার কথা মনে রাখে না, বরং চারপাশের চিহ্ন দেখেই এগোয়। অর্থাৎ, লাল হারভেস্টার পিঁপড়াদের সঠিক পথ খুঁজে পেতে দৃশ্যমান ল্যান্ডমার্ক বা চারপাশের চিহ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই ছোট্ট গবেষণা প্রথমে সাধারণ মনে হলেও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অনেক। পিনের মাথার মতো অতি ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক নিয়ে এসব পোকা কীভাবে জটিল কাজ করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সব সময় কৌতূহলী। পিঁপড়ার পথ চেনার কৌশল ভালোভাবে বুঝতে পারলে গবেষকেরা নতুন ধাঁচের রোবট ও সংকেতনির্ভর চালকবিহীন যন্ত্র তৈরি করতে পারবেন, যেখানে কম তথ্য ব্যবহার করেই একটি রোবট অচেনা জায়গায় সহজে চলাফেরা করতে পারবে।

পড়াশোনার বাইরে সিউংআ ছবি আঁকতে ভালোবাসে। সে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আরিয়ারি২১’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোর দেয়ালে ম্যুরাল এঁকে দেয়। ভবিষ্যতে অণুজীববিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে এই কিশোরী। দামি ল্যাবরেটরি বা জটিল যন্ত্রপাতি ছাড়াই কেবল ২০০টি পিঁপড়া, একটি গোলকধাঁধা আর গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সে প্রমাণ করেছে, বড় আবিষ্কারের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো জানার আগ্রহ।