প্রযুক্তির এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক বিষয় নির্বাচন। ভর্তি পরবর্তী চার বছর শেষে বের হওয়ার সময় কর্মক্ষেত্রের চিত্র হয়তো পুরোপুরি বদলে যাবে। ফলে আজকের সিদ্ধান্তই যে আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) উপাচার্য এ বি এম শওকত আলী, যিনি অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগে—কোন বিষয়ে পড়ব, ক্যারিয়ার কীভাবে গড়ব? এই একটি সিদ্ধান্ত যে সারা জীবনের পথ ঠিক করে দেবে, এমন ধারণা এখন আর ততটা প্রাসঙ্গিক নয়। এর কারণ, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের কাজ করার পদ্ধতি, শেখার ধরন এমনকি চিন্তাভাবনার কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন আনছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট-২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে বিলুপ্ত হবে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি চাকরি। অর্থাৎ নতুন কর্মসংস্থানের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে সাত কোটি। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে কর্মবাজারে আসছে এক বিশাল রূপান্তর।
এই প্রতিবেদনে আরও দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল পেশার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিগ ডেটা স্পেশালিস্ট, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ১১০ শতাংশ। এর পরেই অবস্থান ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ার (৯০ শতাংশ) এবং এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট (৮২ শতাংশ)। সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপারের চাহিদা বাড়বে ৫৭ শতাংশ, সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্টের ৫৩ শতাংশ এবং ডেটা অ্যানালিস্ট ও সায়েন্টিস্টের ৪১ শতাংশ। এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশাকে কেন্দ্র করে নয়, বরং প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং ডেটাভিত্তিক দক্ষতার প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি মন্তব্য করেছেন, মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ২০ বা ৩০ বছর পর কর্মবাজার কেমন হবে তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না। তাই আজকের প্রিয় বিষয়টি চার বছর পর যে একই গুরুত্ব বহন করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই কারণেই কম্পিউটার সায়েন্স, ডেটা সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর কদর আগামী দিনে আরও বাড়বে। পাশাপাশি মেশিন লার্নিং, রোবোটিকস, সাইবার নিরাপত্তা এবং ইন্টারনেট অব থিংসের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ জনবলের চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। গণিত, যুক্তি এবং পরিসংখ্যানে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ক্ষেত্রগুলো হতে পারে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
তবে এআই যে শুধু কম্পিউটার সায়েন্সের বিষয়, এমনটি নয়। ব্যবসায় শিক্ষা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি, আইন কিংবা সাংবাদিকতা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ছে। আইনে এআই চালিত নথি বিশ্লেষণ, কৃষিতে ডেটাভিত্তিক ফলন পূর্বাভাস, চিকিৎসায় রোগনির্ণয়ে এআইয়ের ব্যবহার এর প্রমাণ। তাই যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা করলেও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং তা কাজে লাগানোর দক্ষতা অর্জন এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের মূল বিষয়ের পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং বা প্রযুক্তি সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।
এআই নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হলে প্রথমেই এআই প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে তার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে এবং কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে যা এআই সহজে অনুকরণ করতে পারে না। যেমন—নেতৃত্ব, কার্যকর যোগাযোগ, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা। তৃতীয়ত, শিক্ষাজীবন শেষে শেখা থেমে যাবে—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যৎ-চিন্তক অ্যালভিন টফলার বলেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃত নিরক্ষর তারা নয় যারা পড়তে ও লিখতে জানে না, বরং তারা যারা নতুন করে শিখতে, পুরোনো ধারণা ভুলে যেতে এবং আবার শিখতে জানে না।
অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে উপাচার্য বলেন, সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে জোর করার পরিবর্তে তাকে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করা উচিত। পরীক্ষার ফলাফল বা সামাজিক প্রত্যাশার চেয়ে সন্তানের প্রকৃত আগ্রহ, সক্ষমতা ও শেখার মানসিকতাকে গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনে। সবশেষে, বিষয় নির্বাচনের সময় দ্বিধাগ্রস্ত না হয়ে নিজের আগ্রহ, দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রযুক্তি ও পেশার ধরন বদলাবে, কিন্তু শেখার আগ্রহ, নতুন দক্ষতা অর্জনের মানসিকতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা—এই তিন গুণ কখনো পুরোনো হবে না। আজ যে শিক্ষার্থী এই প্রস্তুতি শুরু করবে, এআই নির্ভর আগামী পৃথিবীতে সে-ই এগিয়ে থাকবে।




