বাংলাদেশের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক এক অদ্ভুত রহস্যে মোড়া। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান সংযোগ নেই, ভাষা বা খাবারেও কোনো মিল নেই। ঋতুও ভিন্ন। তবুও আর্জেন্টিনার কোনো ব্যক্তি যদি হঠাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বিশ্বকাপের একটি রাত কাটান, তাহলে তিনি অবাক হয়ে ভাববেন—এতদিন ভুল দেশেই ছিলেন তারা! কারণ, পৃথিবীর আর কোনো প্রান্তে সম্ভবত হাজার হাজার মানুষ ভোরবেলায় বৃষ্টিতে ভিজে অন্য একটি দেশের জন্য এতটা উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। শনিবার রাত থেকে ঢাকায় বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, যা ভোর পেরিয়ে দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বড় পর্দার সামনে নীল-সাদা পতাকা ভিজতে থাকে। কেউ চশমা পরিষ্কার করছেন, কেউ জার্সি নিংড়ে দিচ্ছেন, আর কেউ গোলের অপেক্ষায় দুই হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে। এই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা টিএসসিতে খেলা উপভোগ করছে। এই আনন্দের পাশাপাশি নীল বেদনাও ছিল। কারণ একই সময়ে সেই বৃষ্টি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অন্য এক বিষাদের কাহিনী লিখছে। বান্দরবান, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে ভেসে উঠেছে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর ছবি, যিনি প্রাণ বাঁচাতে গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, বন্যার পানি কবর ছুঁয়ে মৃতদেহ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একই আকাশের বৃষ্টি কত ভিন্নভাবে কথা বলতে পারে, বাংলাদেশ তা আবারও প্রত্যক্ষ করল। প্রবল বৃষ্টি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টিনার ম্যাচ উপভোগ করতে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। মজার বিষয় হলো, মেসি শুধু বিশ্বকাপ জিতেননি, তিনি বাংলাদেশের অনেক পারিবারিক বিতর্কেরও অবসান ঘটিয়েছেন। বহু বাড়িতে বাবার ম্যারাডোনা আর ছেলের মেসি এখন শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে। বিশ্বকাপ সম্ভবত সংসারের কিছু সমস্যাও সমাধান করে দেয়। একই মেঘ, একই বৃষ্টি, কিন্তু দুই রকম বাংলাদেশ। এই দেশের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই—আনন্দ ও বেদনা পালা করে আসে না, তারা প্রায়ই একই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। টিএসসির সেই তরুণ হয়তো বিকেলেই বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহের একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। এই দেশের মানুষ এমনই—কান্না আর হাসিকে আলাদা আলমারিতে রাখে না। আর্জেন্টিনা ফুটবলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও তেমন। এটি জয়ের ইতিহাস নয়, বরং অপেক্ষার ইতিহাস। একটি প্রজন্ম ম্যারাডোনায় দেখেছিল অসম্ভব প্রতিভার উন্মাদনা, পরের প্রজন্ম বাতিস্তুতার গোলে নিজেদের কৈশোর খুঁজে পেয়েছে। কেউ ক্যানিজিয়ার দৌড়, কেউ ওর্তেগার অপূর্ণতা, ভেরনের পাস, আগুয়েরোর গোল, দি মারিয়ার নীরবতা—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা বাংলাদেশে কখনো একটি দল ছিল না, বরং সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা একটি স্মৃতি। তারপর এলেন মেসি, যিনি বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের অনেক বিতর্কেরও সমাপ্তি টেনেছেন। এখন বাবার ম্যারাডোনা আর ছেলের মেসি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে। একই আকাশ, একই বৃষ্টি, একই বাংলাদেশ… টিএসসির ভেজা পতাকাগুলো শুকাতে শুরু করল, কিন্তু পাহাড়ে তখনো কাপড় শুকানোর মতো রোদ ওঠেনি। এখানে আনন্দ আর উদ্বেগ প্রায়ই একই বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরে। এই ভালোবাসার কোনো ব্যাখ্যা নেই, থাকার দরকারও নেই। সব ভালোবাসা যুক্তি মেনে জন্মায় না—কিছু জন্মায় অভ্যাস থেকে, কিছু অপেক্ষা থেকে, কিছু স্মৃতি থেকে।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা: বৃষ্টি আর বন্যার মাঝে নীল-সাদার উচ্ছ্বাস
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা বৃষ্টি ভিজে আর্জেন্টিনার ম্যাচ উপভোগ করেছেন, অন্যদিকে একই বৃষ্টি দেশের দক্ষিণ-পূর্বে বন্যা ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের জীবনযাত্রার এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে।


