কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর অপরিচিত শব্দ নয়। তবে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসককে সারাক্ষণ কম্পিউটার স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকতে দেখলে প্রশ্ন জাগে—চিকিৎসকের মূল কাজটি কোথায়? বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো এই প্রশাসনিক জটিলতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি দেখা দেবে। এর একটি বড় কারণ, চিকিৎসকদের অনেক মূল্যবান সময় কেটে যায় ফাইল তৈরি, আর্থিক হিসাব ও ডেটা এন্ট্রির মতো কাজে। নিউইয়র্কের হসপিটাল ফর স্পেশাল সার্জারির প্রযুক্তি প্রধান আশিস বারাদ জানান, কিবোর্ড ও স্ক্রিনের পেছনে এত বেশি সময় নষ্ট হচ্ছে যে মূল কাজটিই করা যাচ্ছে না। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাচ্ছে এজেন্টিক এআই নামের নতুন প্রযুক্তি, যা স্বাস্থ্যসেবাকে পুনর্মানবিকীকরণে সহায়ক হতে পারে।
প্রচলিত চ্যাটবটগুলো কেবল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু নিজে থেকে কোনো কাজ সম্পন্ন করতে পারে না। এজেন্টিক এআই এক ধাপ এগিয়ে — এটি স্বয়ংক্রিয় কাজের ধারা অনুসরণ করে। মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের মতো, এটি উদ্দীপনা পেয়ে বিশ্লেষণ করে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্য সম্পাদন করে। এই প্রক্রিয়াটি তিনটি ধাপে বিভক্ত: প্রথমে এটি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে, দ্বিতীয় ধাপে যুক্তি প্রয়োগ করে সঠিক পদক্ষেপ নির্ধারণ করে, এবং তৃতীয় ধাপে মানুষের সাহায্য ছাড়াই ফরম পূরণ, ফাইল পাঠানো বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিংয়ের মতো কাজ সম্পন্ন করে।
স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে জটিল ও গাণিতিক কাজগুলোর একটি হলো মেডিকেল বিলিং, যা রেভিনিউ সাইকেল ম্যানেজমেন্ট (আরসিএম) নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য আলাদা আইসিডি ও সিপিটি কোড ব্যবহার করা হয়। এই কোডিংয়ে সামান্য ভুল হলে বিমা কোম্পানি বিল বাতিল করতে পারে, ফলে হাসপাতালগুলোর বিপুল ক্ষতি হয়। আগে এই ভুল সংশোধন করতে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় লাগত, কিন্তু এজেন্টিক এআই নিজস্ব অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মাত্র ৫ মিনিটেই নিখুঁতভাবে এই কাজটি সম্পন্ন করে দিচ্ছে।
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছে বহু বড় প্রতিষ্ঠান। এপিক সিস্টেমস ও সার্নারের মতো ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এআই এজেন্টের মাধ্যমে ডাটাবেজ পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, অলিভ এআই ও ট্র্যানসেন্ডেন্স ব্যাক-অফিস অপারেশন স্বয়ংক্রিয় করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অবকাঠামো তৈরি করছে। হেলথটেক প্রতিষ্ঠান কমিউর স্বাস্থ্যসেবার বিশাল ডেটাকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে এনে এআই এজেন্টগুলোর কার্যক্রম সহজ করছে। এই বিপ্লব শুধু উন্নত দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশও এই যাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে — রাজধানী ঢাকায় বসেই কমিউর বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদেরা যুক্তরাষ্ট্রের মেথোডিস্ট বা সাটার হেলথের মতো বিখ্যাত হাসপাতাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে কাজ করছেন। দেশীয় প্রকৌশলী ও ডেটা অ্যানালিস্টরা এমন এআই সিস্টেম তৈরি করছেন যা চিকিৎসকের কথা শুনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেসক্রিপশন ও নোট তৈরি করতে পারে এবং জটিল বিলিং প্রক্রিয়া সহজ করে তোলে।
প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য মানুষকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং মানুষকে আরও মানবিক করে তোলা। এজেন্টিক এআই যখন একঘেয়ে কাজগুলো নিজে সম্পন্ন করে, তখন চিকিৎসকরা রোগীর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন, তাদের কথা শুনতে পারেন এবং আরও বেশি সময় ও সহানুভূতি দিতে পারেন। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞান আরও মানবিক হয়ে উঠছে, যা এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য।




