বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলায় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম সানুহার–ধামুরা–সাতলা সড়ক বর্তমানে চরম বেহাল অবস্থায় রয়েছে। ১২ ফুট প্রশস্ত ও ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথটি উপজেলা সদর, হাসপাতাল, থানা, ব্যাংক, বাজার এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সংযোগের মূল ধমনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাস, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও ট্রাকসহ নানা যানবাহন নিয়মিত এই পথে চলাচল করে। কিন্তু সড়কটির প্রায় সমগ্র অংশই ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে; কোথাও সেসব গর্তে বৃষ্টির পানি ও কাদা জমে আছে। যার কারণে পাঁচটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

এই সড়কটি সাতলা, হারতা, জল্লা, শোলক ও বামরাইল—এই পাঁচটি ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে বিস্তৃত। প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এই পথে যাতায়াত করেন। উপজেলা ও বিভাগীয় শহরে যাতায়াতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। স্থানীয়রা জানান, ২০০১ সালের শেষের দিকে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত আট বছরে কোনো ধরনের সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হয়নি। এর ফলে পুরো অংশজুড়ে ছোট–বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে এবং পথটি চলাচলের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় অটোরিকশা চালক রহিম ব্যাপারী জানান, প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে এই পথে গাড়ি চালাতে হয়। গর্ত এড়ানোর চেষ্টায় প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যানবাহনের যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আয়ও কমে গেছে। শোলক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার আবদুল হালিম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির সংস্কারের জন্য বারবার চেষ্টা করা হলেও কেবল আশ্বাসই পাওয়া গেছে। মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে কারও কোনো উদ্বেগ নেই।

স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেনের অভিজ্ঞতা আরও স্পষ্ট। তার ভাষায়, বৃষ্টি হলে স্কুলে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। যাতায়াতের পথে কাদাপানিতে ভিজে একাকার হতে হয়। বৃষ্টির পানিতে সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক বদরুজ্জামান উল্লেখ করেন, ভাঙাচোরা সড়কের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দ্রুত টেকসই সংস্কার না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) উজিরপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, সাতলা একটি পর্যটন এলাকা; এখানে পদ্মবিল অবস্থিত। বর্ষা মৌসুমে বিপুলসংখ্যক পর্যটক এই পথ দিয়ে আসা–যাওয়া করেন। বর্তমানে পুরো সড়কটিই প্রায় চলাচলের অনুপযোগী। তাই সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

যোগাযোগ ও পরিবহন খাতের প্রতিনিধিরাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বরিশাল বাস মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মিরাজ শিকদার বলেন, বড় পণ্যবাহী ট্রাক ও গাছের গুঁড়ি বহনকারী যান নিয়মিত চলাচলের কারণে সড়কের অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। এখন যানবাহন চালানোর মতো উপযোগী পরিবেশ নেই। বিকল্প পথ না থাকায় নিরুপায় হয়ে বাস চালাতে হচ্ছে।

প্রকল্প ও প্রশাসনিক দিক থেকে জানা যায়, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে সড়কটির সংস্কারের জন্য তিনটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ ফুট থেকে ১৪ ফুট প্রশস্ত করা এবং দুই পাশে আরও চার ফুট মাটি কিনারা (শোল্ডার) নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে সানুহার থেকে ধামুরা ও ধামুরা থেকে জল্লা পর্যন্ত মোট ১৬ কিলোমিটার সড়কের দুটি প্যাকেজের কাজ পায় ইফতি–ইটিসিএল নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অপর প্যাকেজে জল্লা থেকে সাতলা পর্যন্ত আট কিলোমিটারের কাজ পায় বরিশালের আমিন ইঞ্জিনিয়ারিং; এই অংশের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

কিন্তু প্রথম দুটি প্যাকেজের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক পিরোজপুর–২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ। কাজ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কিছুদিন কাজ করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর তিনি দেশ ছাড়েন। এরপর ওই দুটি প্যাকেজের কাজ পুরোপুরি স্থগিত হয়ে যায়।

আরেক দিকে, গত মে মাসে আট কিলোমিটার অংশের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৪ কোটি ২০ লাখ টাকার এই কাজটি পেয়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকার মেসার্স মোমিনুল হক নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত জুনে এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি আট কিলোমিটারের জন্য এখনো দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি।

উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায় প্রথম আলোকে বলেন, ২৪ কিলোমিটার সড়কটি সংস্কারে তিনটি প্যাকেজে দরপত্র দেওয়া হয়েছিল। একটি প্যাকেজের কাজ চলমান। বাকি দুটি প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হয়নি। নতুনভাবে ওই দুটির মধ্যে একটির দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে। অপর প্যাকেজটি এখনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় দরপত্র আহ্বান করা যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে, উজিরপুরের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারের অপেক্ষায় থাকায় প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের জীবনে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি যোগ হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতির আরও অবনতি অনিবার্য বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।